সাবডিউরাল হেমাটোমা কী? মাথায় আঘাত পাওয়ার পর যেসব লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন

সাবডিউরাল হেমাটোমা
ফিচার
স্বাস্থ্য
0

স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সামান্য অবহেলা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো দুর্ঘটনাও অনেক সময় জীবনকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে মাথায় সামান্য আঘাত পাওয়ার ঘটনাকেও কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না (What is Subdural Hematoma: Critical Warning Signs After Head Injury You Should Never Ignore)। মস্তিষ্কের আঘাতজনিত বা ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরির এ রকমই একটা মারাত্মক ও জটিল রূপ হলো ‘সাবডিউরাল হেমাটোমা’ (Subdural hematoma or brain bleeding)। সময়মতো এর লক্ষণ চেনা না গেলে এটি মানুষের মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে।

সাবডিউরাল হেমাটোমা আসলে কী? (What is Subdural Hematoma and Brain Layer Anatomy)

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সাবডিউরাল হেমাটোমা হলো মস্তিষ্কের আবরণ ও মস্তিষ্কের উপরিভাগের মাঝখানের স্তরে রক্ত জমাট বাঁধা (Blood clot inside the skull)। আমাদের মানব মস্তিষ্কের চারপাশে সুরক্ষার জন্য তিন স্তরের একটি প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ বা আবরণ থাকে, যার সবচেয়ে বাইরের শক্ত স্তরটিকে বলা হয় ‘ডুরা ম্যাটার’ (Dura mater)।

যখন কোনো দুর্ঘটনার আঘাতে মস্তিষ্কের এই স্তরের নিচের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ছিঁড়ে যায়, তখন ডুরা ম্যাটারের নিচে দ্রুত রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে। এই ক্ষরিত রক্ত বাইরে বের হতে না পেরে ভেতরেই জমাট বেঁধে যায় এবং সংবেদনশীল মস্তিষ্কের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকেই সাবডিউরাল হেমাটোমা বলা হয়।

আরও পড়ুন:

সাবডিউরাল হেমাটোমার প্রকারভেদ (Types of Subdural Hematoma: Acute vs Chronic)

চিকিৎসকদের মতে, মস্তিষ্কের এই রক্তক্ষরণ বা হেমাটোমা প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে—

১. অ্যাকিউট বা তীব্র হেমাটোমা (Acute Subdural Hematoma): এটি সাধারণত বড় কোনো সড়ক দুর্ঘটনা, উপর থেকে পড়ে যাওয়া বা মারাত্মক কোলাইডাল আঘাতের পরপরই (২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে) দেখা দেয়। এটি একটি চরম মেডিকেল ইমার্জেন্সি এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক।

২. ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী হেমাটোমা (Chronic Subdural Hematoma): এটি মূলত প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। অনেক সময় বাথরুমে বা বিছানা থেকে মৃদু আঘাত পাওয়ার কয়েক সপ্তাহ বা মাস খানেক পরও এর লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

আরও পড়ুন:

মাথায় আঘাতের পর যেসব লক্ষণ দেখলেই সতর্ক হবেন (Warning Symptoms After a Head Injury)

মাথায় আঘাত পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সমস্যা মনে না হলেও পরবর্তী কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ নিচের লক্ষণগুলোর দিকে কড়া নজর রাখতে হবে (Brain injury red flag symptoms):

তীব্র বা ক্রমবর্ধমান মাথাব্যথা: সাধারণ পেইনকিলারেও যে মাথাব্যথা কমে না বরং সময়ের সাথে বাড়ে (Progressive severe headache)।

বমি বমি ভাব বা অনবরত বমি: মাথায় আঘাতের পর বমি হওয়া মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ চাপের অন্যতম প্রধান লক্ষণ (Vomiting after head trauma)।

ভারসাম্যহীনতা ও শারীরিক দুর্বলতা: হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, শরীর কাঁপানো বা শরীরের একপাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া।

কথা জড়িয়ে যাওয়া ও বিভ্রান্তি: স্পষ্ট কথা বলতে না পারা কিংবা হঠাৎ করে চেনা পরিবেশ বা মানুষকে চিনতে বিভ্রান্ত বোধ করা (Slurred speech and confusion)।

স্মৃতিশক্তি হ্রাস বা আচরণগত পরিবর্তন: প্রবীণদের ক্ষেত্রে হঠাৎ অলসতা, অতিরিক্ত ঘুমানো, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক খিটখিটে আচরণ করা।

আরও পড়ুন:

কেন হয় এবং কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি? (Causes and Risk Factors of Subdural Hematoma)

এই রোগের প্রধানতম কারণ হলো মাথায় যেকোনো ধরনের ট্রমা বা আঘাত (Head trauma causes)। তবে সব সময় বড় দুর্ঘটনা থেকেই এমনটা হবে তা কিন্তু নয়; সিঁড়ি থেকে নামার সময় সামান্য পা হড়কানো, বাথরুমে পিছলে যাওয়া কিংবা ঘরের কোনো আসবাবের সাথে মাথায় মৃদু বাড়ি লাগার ফলেও নীরবে এই রক্তক্ষরণ ঘটতে পারে।

উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন যারা (High Risk Groups):

রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবনকারী: যারা হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকির কারণে রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট (Blood thinners or anticoagulant medications) খাচ্ছেন, তাদের সামান্য আঘাতেও তীব্র রক্তক্ষরণ হয়।

প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তি: বয়সের কারণে প্রবীণদের মস্তিষ্কের টিস্যু কিছুটা সংকুচিত বা ছোট (Brain atrophy) হয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কের ভেতরের রক্তনালিগুলো টানটান অবস্থায় থাকে এবং খুব সামান্য ঝাকুনি বা আঘাতেই ছিঁড়ে যায়।

আরও পড়ুন:

রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা (Diagnosis and Treatment of Subdural Hematoma)

মাথায় আঘাতের পর কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে চিকিৎসকেরা দ্রুত রোগীকে জরুরি সিটি স্ক্যান (Brain CT Scan) বা প্রয়োজনভেদে এমআরআই (MRI) করার পরামর্শ দেন। এর মাধ্যমেই মস্তিষ্কে জমাট বাঁধা রক্তের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

যদি জমাটবদ্ধ রক্তের পরিমাণ কম থাকে, তবে ওষুধের মাধ্যমে তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু রক্তের পরিমাণ বেশি হলে এবং তা মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করলে রোগীকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে নিউরোসার্জারি বা মাথার খুলি ফুটো করে অস্ত্রোপচার (Craniotomy or Burr hole surgery) করে জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণ করতে হয়। সঠিক সময়ে সঠিক নিউরোসার্জিক্যাল চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

তাই প্রবীণ বা শিশুদের মাথায় যেকোনো আঘাতকে গুরুত্ব দিন। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিকটস্থ নিউরোলজি বা ট্রমা সেন্টারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

আরও পড়ুন:

একনজরে সাবডিউরাল হেমাটোমার লক্ষণ, ঝুঁকি ও জরুরি চিকিৎসা নির্দেশিকা (Subdural Hematoma Symptoms, Risks & Emergency Guidelines at a Glance)


মেডিকেল কন্ডিশন
(Medical Condition)
বিপজ্জনক লক্ষণ (অবহেলা করা যাবে না)
(Red Flag Symptoms to Watch)
উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা গ্রুপ ও চিকিৎসা
(High Risk Groups & Diagnosis)
অ্যাকিউট বা তীব্র হেমাটোমা
(Acute - তীব্র আঘাতের পর)

• তীব্র বা অনবরত ক্রমবর্ধমান মাথাব্যথা

• বারবার বমি বমি ভাব হওয়া কিংবা বমি করা

• অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা তীব্র মাথা ঘোরানো

উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপ:

• বয়োবৃদ্ধ বা প্রবীণ ব্যক্তি

• রক্ত পাতলা করার ওষুধ ব্যবহারকারী


জরুরি পরীক্ষা:

মস্তিষ্কের দ্রুত সিটি স্ক্যান (Brain CT Scan) বা এমআরআই

ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী হেমাটোমা
(Chronic - মৃদু আঘাতের কয়েক সপ্তাহ পর)

• হাঁটার সময় ভারসাম্যহীনতা ও পড়ে যাওয়া

• কথা জড়িয়ে যাওয়া বা হুট করে বিভ্রান্ত বোধ করা

• প্রবীণদের আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন ও অলসতা

• হঠাৎ স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক খিটখিটে ভাব

প্রধান চিকিৎসা
(Treatment Procedure)

পর্যবেক্ষণ ও ওষুধ: রক্তক্ষরণের পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকলে নিউরোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে ওষুধের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।

জরুরি অস্ত্রোপচার (Surgery): জমাটবদ্ধ রক্তের পরিমাণ বেশি হলে এবং তা মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করলে দ্রুত নিউরোসার্জারি (Burr Hole / Craniotomy) করে রক্ত অপসারণ করা অত্যন্ত জরুরি।

মেডিকেল ইমার্জেন্সি নোটিশ: মাথায় আঘাত পাওয়ার ঘটনা সব সময় বাহ্যিক রক্তপাত দিয়ে বোঝা যায় না; বাথরুমে পিছলে যাওয়া কিংবা সিঁড়িতে মৃদু আঘাত থেকেও মগজের ভেতরে নীরবে রক্তক্ষরণ হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আঘাত পাওয়ার পর ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত তাদের আচরণ ও শারীরিক নড়াচড়ার দিকে কড়া নজর রাখুন। যেকোনো অস্বাভাবিকতায় কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

এসআর