জাতীয় স্মৃতিসৌধ: বীর শহীদদের স্মরণে জাতির শ্রদ্ধার চিরন্তন প্রতীক

শিমুল রহমান
সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ
ফিচার
দেশে এখন
0

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য সন্তানদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর জাতীয় স্মৃতিসৌধ (National Martyrs' Memorial)। রাজধানী ঢাকা থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাভার উপজেলায় ৪৪ হেক্টর জমি নিয়ে বিস্তৃত এই কমপ্লেক্সটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে (Great Liberation War 1971) আত্মদানকারী বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত।

একনজরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ

  • স্থপতি ও উচ্চতা: স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন; উচ্চতা ১৫০ ফুট।
  • সাতটি স্তম্ভের তাৎপর্য: ১৯৫২ (ভাষা আন্দোলন), ১৯৫৪ (যুক্তফ্রন্ট), ১৯৫৬ (শাসনতন্ত্র), ১৯৬২ (শিক্ষা), ১৯৬৬ (ছয় দফা), ১৯৬৯ (গণঅভ্যুত্থান) এবং ১৯৭১ (মুক্তিযুদ্ধ)।
  • স্থাপনা: মূল স্তম্ভ, গণকবর, স্মৃতি জাদুঘর, উন্মুক্ত মঞ্চ, হেলিপ্যাড এবং কৃত্রিম লেক।
  • পরিদর্শন সময়: প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা (প্রবেশ মূল্য নেই)।
  • যাতায়াত: মতিঝিল/গুলিস্তান থেকে বিআরটিসি, হানিফ বা নন্দন বাস এবং মিরপুর থেকে তিতাস পরিবহন।
  • নিয়ম: মূল বেদীতে জুতা পরা নিষেধ; ড্রোন বা প্রফেশনাল শ্যুটিংয়ে অনুমতি প্রয়োজন।

আরও পড়ুন:

স্থাপত্য শৈলী ও তাৎপর্য (Architecture and Significance)

স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের (Syed Mainul Hossain) নকশায় নির্মিত এই সৌধের মূল কাঠামোটি সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজানো এই দেয়ালগুলো বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের সাতটি পর্যায়কে নির্দেশ করে। সৌধটির সর্বোচ্চ উচ্চতা ১৫০ ফুট (150 Feet High)। এর মূল কাঠামো কংক্রিটের হলেও কমপ্লেক্সের অন্যান্য অংশ লাল ইটের তৈরি, যা শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্বাতন্ত্র্য উন্মেষকে ফুটিয়ে তোলে।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল |ছবি: এখন টিভি

ইতিহাস ও বধ্যভূমি (History and Mass Grave)

সাভারের এই এলাকাটি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাক্ষী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সাভারের অসংখ্য গ্রামবাসীকে হত্যা করে যে স্থানে মাটিচাপা দিয়েছিল, সেখানেই আবিষ্কৃত হয় বধ্যভূমি। এই গণকবরগুলো (Mass Graves) স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মূল সৌধের সামনের জলাশয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা এবং জাতীয় পতাকার প্রতিফলন এক অভূতপূর্ব গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করে।

আরও পড়ুন:

জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাতটি স্তম্ভ: বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি মহাকাব্যিক অধ্যায়

সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এটি বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের এক মূর্ত প্রতীক। স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন সৌধের মূল কাঠামোতে যে সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল (Seven Pairs of Triangular Walls) ব্যবহার করেছেন, তার প্রতিটি জোড়া নির্দেশ করে এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সাতটি স্তম্ভের তাৎপর্য (Significance of the 7 Pillars)

স্মৃতিসৌধের এই সাতটি দেয়াল ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজানো হয়েছে, যা ধাপে ধাপে আমাদের চূড়ান্ত স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। পর্যায়গুলো হলো:

  • ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন: আমাদের জাতিসত্তার প্রথম জাগরণ।
  • ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন: বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয়।
  • ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন: অধিকার আদায়ের নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম।
  • ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন: বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজের রুখে দাঁড়ানো।
  • ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন: বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত।
  • ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান: স্বৈরাচার বিরোধী দুর্বার আন্দোলন।
  • ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ: চূড়ান্ত বিজয় ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

এই সাতটি স্তম্ভের সমন্বয়ে গঠিত মূল সৌধটি ১৫০ ফুট উঁচু, যা বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার শাশ্বত আহ্বান জানায়।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ | ছবি: সংগৃহীত

দর্শনার্থীদের জন্য তথ্য (Information for Visitors)

প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত স্মৃতিসৌধ সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে। এখানে প্রবেশের জন্য কোনো প্রবেশ মূল্য (Entrance Fee) নেই।

আরও পড়ুন:

ঢাকা থেকে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ: জেনে নিন যাওয়ার সহজ উপায় ও বাস সার্ভিস

মহান শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাতায়াত করেন। ঢাকা থেকে সরাসরি স্মৃতিসৌধে যাওয়ার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু জনপ্রিয় বাস সার্ভিস (Bus Services) চালু রয়েছে। নিচে যাতায়াতের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো:

সরাসরি যাতায়াতের বাস সার্ভিস (Direct Bus Services)

১. বিআরটিসি বাস সার্ভিস (BRTC Bus Service): ঢাকা থেকে স্মৃতিসৌধে যাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো বিআরটিসি। এই বাসগুলো মতিঝিল ও গুলিস্তান থেকে ছেড়ে শাহবাগ, ফার্মগেট, আসাদগেট, শ্যামলী, গাবতলী এবং সাভার হয়ে সরাসরি স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটকের সামনে যায়।

২. মতিঝিল ও গুলিস্তান রুট (Motijheel & Gulistan Route): এই এলাকা থেকে হানিফ (Hanif), নন্দন সুপার (Nandan Super) এবং গ্রীনওয়ে (Greenway) বাস সার্ভিস সরাসরি নবীনগর পর্যন্ত যাতায়াত করে। নবীনগর নামলেই স্মৃতিসৌধের প্রবেশ পথ পাওয়া যায়।

৩. মিরপুর রুট (Mirpur Route): মিরপুর ১২ নম্বর থেকে 'তিতাস পরিবহন' (Titas Paribahan) নিয়মিত ছেড়ে আসে। এই বাসটি মিরপুর ১০, মিরপুর ১, টেকনিক্যাল, গাবতলী ও সাভার হয়ে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত যায়।

আরও পড়ুন:

ভ্রমণের সময় ও দূরত্ব (Travel Time and Distance)

ঢাকা থেকে সাভার স্মৃতিসৌধের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। ট্রাফিক জ্যাম না থাকলে বাসে যেতে ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টা সময় লাগে। ব্যক্তিগত গাড়িতে বা রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করেও সহজে স্মৃতিসৌধে যাওয়া সম্ভব।

জাতীয় স্মৃতিসৌধের অন্দরমহল: স্থাপনা, প্রথা এবং দর্শনার্থীদের জন্য গাইডলাইন

১. স্মৃতিসৌধের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (Key Structures in the Complex)

স্মৃতিসৌধের ভেতরে মূল স্তম্ভ ছাড়াও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে যা অনেকেই জানেন না:

উন্মুক্ত মঞ্চ (Open Stage): বিভিন্ন জাতীয় দিবসে এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

হেলিপ্যাড (Helipad): বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা ভিভিআইপিদের যাতায়াতের জন্য এখানে নিজস্ব হেলিপ্যাড রয়েছে।

স্মৃতি জাদুঘর (Memorial Museum): এখানে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থিরচিত্র ও তথ্য সংরক্ষিত আছে।

আরও পড়ুন:

২. বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের শ্রদ্ধা নিবেদন (Tributes by World Leaders)

বাংলাদেশে আসা প্রায় সকল বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব সাভার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাদের সফরের স্মৃতি হিসেবে এখানে গাছ রোপণ (Tree Plantation) করার একটি প্রথা রয়েছে। এখানে অনেক বিশ্বনেতার লাগানো নামফলকসহ গাছ দেখা যায়।

৩. বিশেষ দিনের আলোকসজ্জা ও পরিবেশ (Lighting & Atmosphere)

১৬ই ডিসেম্বর ও ২৬শে মার্চ: এই দুই দিনে স্মৃতিসৌধকে বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। ভোরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রথম পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

পুষ্পস্তবক অর্পণ বিধি: সাধারণ মানুষের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।

আরও পড়ুন:

৪. ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফি নিয়ম (Photography Rules)

অনেকেই জানতে চান সেখানে ড্রোন ওড়ানো বা প্রফেশনাল ক্যামেরা ব্যবহারের নিয়ম। সাধারণত মোবাইল ফোনে ছবি তোলা গেলেও, প্রফেশনাল ভিডিও বা ড্রোনের জন্য জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হয়।

৫. সচেতনতামূলক তথ্য (Security & Code of Conduct)

  • সৌধের মূল বেদীতে জুতা পরে ওঠা নিষেধ।
  • কমপ্লেক্সের ভেতরে ধুমপান বা উচ্চস্বরে গান বাজানো নিষিদ্ধ।
  • শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য গম্ভীর পরিবেশ বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া থাকে।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর-FAQ

প্রশ্ন: জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি কে?উত্তর: জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি হলেন সৈয়দ মাইনুল হোসেন।

প্রশ্ন: জাতীয় স্মৃতিসৌধের উচ্চতা কত?

উত্তর: এর উচ্চতা ১৫০ ফুট (প্রায় ৪৫.৭২ মিটার)।

প্রশ্ন: জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাতটি স্তম্ভ বা দেয়াল কী নির্দেশ করে?

উত্তর: এই সাতটি স্তম্ভ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে (১৯৫২ থেকে ১৯৭১) নির্দেশ করে।

প্রশ্ন: জাতীয় স্মৃতিসৌধ কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: এটি ঢাকা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাভার উপজেলায় অবস্থিত।

প্রশ্ন: স্মৃতিসৌধ প্রতিদিন কখন খোলা থাকে?

উত্তর: এটি প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।

প্রশ্ন: জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রবেশ মূল্য কত?

উত্তর: জাতীয় স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সে প্রবেশের জন্য কোনো প্রবেশ মূল্য বা টিকেটের প্রয়োজন নেই; এটি সবার জন্য উন্মুক্ত।

প্রশ্ন: ঢাকা থেকে স্মৃতিসৌধ যাওয়ার সেরা উপায় কী?

উত্তর: মতিঝিল বা গুলিস্তান থেকে বিআরটিসি (BRTC) বা নন্দন সুপার বাসে এবং মিরপুর থেকে তিতাস পরিবহনে সরাসরি যাওয়া যায়।

প্রশ্ন: স্মৃতিসৌধের সাতটি স্তম্ভের পর্যায়গুলো কী কী?

উত্তর: ১৯৫২ (ভাষা আন্দোলন), ১৯৫৪ (যুক্তফ্রন্ট), ১৯৫৬ (শাসনতন্ত্র), ১৯৬২ (শিক্ষা), ১৯৬৬ (৬-দফা), ১৯৬৯ (গণঅভ্যুত্থান) এবং ১৯৭১ (মুক্তিযুদ্ধ)।

প্রশ্ন: স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামো কী দিয়ে তৈরি?

উত্তর: মূল সৌধটি কংক্রিটের তৈরি এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলো লাল ইটের তৈরি।

প্রশ্ন: স্মৃতিসৌধের ভেতরে কি কোনো জাদুঘর আছে?

উত্তর: হ্যাঁ, কমপ্লেক্সের ভেতরে একটি ছোট স্মৃতি জাদুঘর রয়েছে যেখানে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত স্থিরচিত্র ও তথ্য রয়েছে।

প্রশ্ন: স্মৃতিসৌধের মূল বেদীতে ওঠার নিয়ম কী?

উত্তর: শহীদদের সম্মানে মূল বেদীতে জুতা পরে ওঠা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

প্রশ্ন: স্মৃতিসৌধে কি প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি বা ড্রোন চালানো যায়?

উত্তর: মোবাইলে ছবি তোলা গেলেও ড্রোন বা প্রফেশনাল শ্যুটিংয়ের জন্য গণপূর্ত বিভাগ (PWD) থেকে আগে অনুমতি নিতে হয়।

প্রশ্ন: স্মৃতিসৌধের আশেপাশে খাবার জায়গা আছে কি?

উত্তর: স্মৃতিসৌধের ঠিক উল্টো পাশে এবং নবীনগর বাস স্ট্যান্ড এলাকায় বেশ কিছু ভালো মানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে।

প্রশ্ন: স্মৃতিসৌধের সামনে জলাশয় কেন রাখা হয়েছে?

উত্তর: জলাশয়ে মূল সৌধ ও জাতীয় পতাকার প্রতিফলন শহীদদের আত্মত্যাগের গাম্ভীর্য ও জাতীয় ফুল শাপলার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে।

প্রশ্ন: সাভার স্মৃতিসৌধ কত একর জমির ওপর নির্মিত?

উত্তর: এটি মোট ৪৪ হেক্টর বা প্রায় ১০৮ একর জায়গার ওপর অবস্থিত।

আরও পড়ুন:

এসআর