সড়ক দুর্ঘটনা ঠেকাতে বন্যপ্রাণীর জন্য ঝুলন্ত সেতু

বন্যপ্রাণীর জন্য ঝুলন্ত সেতু
দেশে এখন
বিশেষ প্রতিবেদন
0

পৃথিবীর প্রাচীন পাতাঝরা অরণ্য মধুপুরের শালবন। বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। বনের প্রাণীরা তাদের খাবারের খোঁজে সড়ক পারাপার হয় প্রতিদিন। এতে যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারায় বহু প্রাণী। এমন পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণী পারাপারে বনের কয়েকটি স্থানে পাঁচটি রোপওয়ে বা ঝুলন্ত সেতু তৈরি করে দিয়েছে বন বিভাগ।

আষাঢ়ের আকাশে তখনো সূর্যকে ঢেকে দেয়া মেঘের যত লুকোচুরি, তেপান্তর জুড়ে এই গাঢ় সবুজ পৃথিবীর প্রাচীন ফুসফুস যেন টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবন। এই গড়ের উৎপত্তি সম্ভবত মায়োসিন সময়কালে। মোট বিস্তার ৪৫ হাজার ৫৬৫ একর হলেও নির্বিচারে বন বিনাশে বর্তমানে বনটির আয়তন এসে ঠেকেছে মাত্র ১০ হাজার ৫০০ একরে। মারাত্মক ঝুঁকিতে বানাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য।

এক সময়ের প্রাকৃতিক জৌলুস ভরা এই অরণ্য এখন উপোষের জনারণ্য। ক্ষুধার জ্বালায় কঙ্কালসার বানর শাবকরা এভাবেই তপ্তরোদে নেমে আসে পিচগলা মহাসড়কে, শুকনো কাঠখড়ি কিংবা বিভিন্ন গাছের পাতার রসটুকু খেয়ে কোনোমতে সচল রাখছে তাদের চর্মসার পাকস্থলী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিত্যদিন খাবারের আশায় আশ্রয় তাই ময়মনসিংহ -টাঙ্গাইল মহাসড়কের ৯ কিলোমিটারের মহাসড়ক।

গেল মাস চারেক আগে এক বানর সাবকটি রাস্তা পারাপারের সময় ট্রাকের চাকায় মারাত্মক আহত হয়ে হারাতে হয় একটি পা। সেই থেকে দলছুট এই বানরটি একাই মহাসড়কে এর তার কাছ থেকে খাবার চেয়ে একরকম বেঁচে থাকে।

আরও পড়ুন:

মূলত সড়ক পারাপার হতে গিয়ে যানবাহনের চাকায় পৃষ্ঠ হয়ে বন্যপ্রাণীরা শুধু আহতই হয় না, প্রাণও হারাতে হয় অহরহ। এমন পরিস্থিতি দেখে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ তাদের শালবন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মাধ্যমে বানর, হনুমান, বনমোরগ, মেছোবিড়াল, গন্ধগোকুলসহ বিভিন্ন প্রাণী নির্বিঘ্নে সড়ক পার হতে পারে, সে জন্যই বনের কয়েকটি স্থানে পাঁচটি রোপওয়ে বা উড়াল সেতু তৈরি করে দিয়েছে। যা এরইমধ্যে নজর কেড়েছেন, স্থানীয়সহ পর্যটকদের। সড়ক পারাপারের সময় রোপওয়েতে লাফালাফি করতে দেখা গেছে বানরদেরও।

স্থানীয়দের মধ্যে একজন বলেন, ‘বানর রোডে আসলে মনে করেন গাড়ি তো দ্রুত সব যায়। সাইডে লাইগা ওই অনেক বানর মারাও যায় বা দুর্ঘটনাও হয়।"

অন্য একজন বলেন, ‘যে নতুন সেতু বানাইছে আমরা খেলাধুলা করতে দেহি বানররে। ঝুলন্ত যে হচ্ছে যে ইয়াগুলা দেখতেছি আর কি, সেতুগুলা দেখতেছি, এগুলা আর কি বানরদের জন্য খুব উপকার।’

আরও পড়ুন:

গাছের সঙ্গে বিশেষভাবে স্থাপন করা এসব রোপওয়ে ব্যবহার করে বানর, হনুমানসহ বনে বসবাসকারী প্রাণীরা এখন নিরাপদে মহাসড়ক পার হতে পারছে। এতে করে বনাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাওয়া বন্যপ্রাণী পুনরুদ্ধারের আশা করছেন বলে দাবি মধুপুর জাতীয় উদ্যানের এই রেঞ্জ কর্মকর্তার। এদিকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, কেবল রোপওয়ে তৈরি নয় বরং নির্বিচারে বনবিনাশ রক্ষার পাশাপাশি বনায়ন বাড়ালেই সুরক্ষিত হবে বন্যপ্রাণী জীববৈচিত্র্য ।

টাঙ্গাইল মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ডেপুটি রেঞ্জার মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘রাস্তার ওপর এক এইপাশ থেকে রাস্তার এইপাশ পাশ থেকে ওইপাশে পার করে দেবার জন্য কিন্তু মূলত এ ধরনের একটি রাস্তার মতো তৈরি করা হয়েছে। যেটাকে একচুয়ালি মাংকি পাস বলা হয়। তো উদ্দেশ্য হলো যেন বন বিভাগ যে উদ্দেশ্য থেকে কাজটি করেছে যে বানরগুলো যেন রাস্তায় না নামে এবং তারা তারা রাস্তায় নামার পরে এক্সিডেন্ট হয় গাড়ির দ্বারা বিভিন্ন রকমভাবে, তাদের সংখ্যা দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে। এসব বিষয়গুলো বিবেচনা করেই ওনারা এটা করেছেন।

আরও পড়ুন:

ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুক বলেন, ‘আমাদের কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় এখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মধুপুর শালবন পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি রোপওয়ে স্থাপন করা হয়। তো আমরা আমাদের কর্তৃপক্ষকে রিকোয়েস্ট করবো যে ভবিষ্যতে আরও যাতে বেশি রোপওয়ে স্থাপনের মাধ্যমে এই বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল যাতে আমরা নিশ্চিত করতে পারি।

বনবিভাগকে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান পরিবেশ বিজ্ঞানীদের।

এসএস