ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধু কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দেখলে তার শিল্পীসত্তার অনেকটাই অজানা থেকে যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনয়কে স্বতন্ত্র শিল্পের মর্যাদা দেয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সাবলীল সংলাপ, নিজস্ব বাচনভঙ্গি এবং অভিনয়ের অসাধারণ সময়জ্ঞান তাকে দুই বাংলার দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৪০-এর দশকে চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু। ‘জাগরণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। এরপর একে একে অভিনয় করেন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘আশিতে আসিও না’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘ভানু পেল লটারি’, ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘হাসপাতাল’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে।
উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের যুগে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন ভানু। অনেক চলচ্চিত্রে প্রধান নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি তার উপস্থিতিই হয়ে উঠত দর্শকের অন্যতম আকর্ষণ। তার অভিনীত চরিত্র ও সংলাপ এখনো বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
তার অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার। ‘ঢাকার পোলা’ পরিচয়কে তিনি নিজের অভিনয়ের শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। তার বাঙাল ভাষার সংলাপ শুধু হাসির জন্ম দেয়নি; দেশভাগের পর দুই বাংলার মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের নানা দিকও তুলে ধরেছে।
১৯২০ সালে মুন্সিগঞ্জে জন্ম নেয়া ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকায়। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, দক্ষিণ মৈশুন্দী, ভজহরি সাহা স্ট্রিট, ভূতের গলি, পোগোজ স্কুল ও সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের সঙ্গে তার জীবনের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পরবর্তী জীবনে কলকাতায় স্থায়ী হলেও, ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি।
অভিনয়ের পাশাপাশি খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবলের প্রতিও তার ছিল গভীর আগ্রহ। ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক হিসেবে নিয়মিত মাঠে যেতেন তিনি। সহশিল্পী জহর রায়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্বও ছিল কিংবদন্তিতুল্য।
তবে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়তার আড়ালে নিজের অভিনয় নিয়ে তার ছিল গভীর সচেতনতা। শুধু হাসানোর যন্ত্র হিসেবে পরিচিত হতে চাননি তিনি। সিরিয়াস চরিত্রেও নিজের অভিনয়ক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ চেয়েছিলেন। তার মতে, ভালো কৌতুক করতে হলে অভিনয়ের মাত্রাজ্ঞান এবং গভীর জীবনবোধ প্রয়োজন।
কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হয়েছেন ভানু। চলচ্চিত্রশিল্পে শিল্পীদের স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় একসময় কয়েক বছর তাকে কাজ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। তখনও অভিনয় ছাড়েননি। যাত্রাপালা ও কৌতুকের অ্যালবামের মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রেখেছিলেন।
১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ কলকাতার উডল্যান্ডস হাসপাতালে মারা যান ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পরও তার অভিনয়, সংলাপ ও স্বতন্ত্র বাচনভঙ্গি বাঙালির সংস্কৃতিতে জীবন্ত।





