শহুরে ব্যস্ততায় ছেলেবেলার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে ‘নবাববাড়ি পুশকুনি’

আহসান মঞ্জিলের পাশে ‘নবাববাড়ি পুশকুনি’
ফিচার
2

দুরন্ত, অদম্য, দুর্নিবার। জলের সঙ্গে যে মিতালি নৈসর্গিক। ঢেউয়ের কুচিগুলো ফিরিয়ে নেবে স্মৃতির মোহনায়। মনে পড়বে ছেলেবেলা, খাল-বিল, নদীনালা।

শহুরে জীবন বড্ড ব্যস্ত। শাওয়ারে গা ধুয়ে কাজে ছোটা মানুষের সাঁতার কাটার ফুরসত কই? আঁটসাঁট রুটিন থেকে সময় বের করে জলাধার খুঁজে পাওয়া বড্ড মুশকিল। বেসরকারি একটি হিসেব বলছে, ১৯৮৫ সালে ঢাকা শহরে প্রায় দুই হাজার পুকুর ছিল। বর্তমানে যেই সংখ্যা নেমেছে একশোর নীচে।

এর মধ্যে একটি পুকুর এখনো ঐতিহ্য ঘিরে বেঁচে আছে রাজধানীতে। যার নাম ‘নবাববাড়ি পুশকুনি’। যাকে স্থানীয়রা ‘গোল তালাব’ নামেও চেনেন। রাজধানীর পুরাতন ঢাকার ইসলামপুর এলাকায় আহসান মঞ্জিলের পাশেই এর অবস্থান। যেখানে এখনো প্রতিদিন গোসল করেন শতাধিক মানুষ।

নবাববাড়ি পুশকুনিতে গোসল করছেন সাধারণ মানুষ |ছবি: এখন টিভি

স্থানীয়রাসহ আশেপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে এখানে গোসল করে থাকেন। দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরাও মাঝেমধ্যে মনের প্রশান্তি খুঁজে বেড়ান এ পুশকুনিতে নেমে।

নবাববাড়ি পুশকুনিতে গোসল করা অবস্থায় একজনের সঙ্গে কথা হয় এখন টিভির। তিনি বলেন, ‘আগে তো গ্রামে পুকুরে-নদীতে গোসল করেছি। কিন্তু ঢাকায় আসার পর এমন সুযোগ আর ছিল না। এখন মাঝেমধ্যেই এখানে আসি। মনে হয় গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করছি।’

কথা হয় স্থানীয় একটি দোকানের কর্মচারীর সঙ্গে। এখন টিভিকে তিনি বলেন, ‘এখানে গোসল করলে আলাদা প্রশান্তি আসে, ভালো লাগে। বাসা-বাড়িতে গোসল করে মজা পাই না। এখানে এসে সাঁতার কাটি, গোসল করি, ভালো লাগে।’

নবাববাড়ি পুশকুনিতে গোসলের জন্য আগমন |ছবি: এখন টিভি

নবাববাড়ি পুশকুনিতে গোসল করতে হলে একজন ব্যক্তিকে দিতে হয় মাত্র ১০ টাকা। এরপর যতক্ষণ ইচ্ছা, পুকুরের জলে গা ভেজানো যায়। পুকুরে সাবান বা শ্যাম্পু ব্যবহারের অনুমতি নেই। পুকুরের সঙ্গেই আলাদা স্থানে সাবান ও শ্যাম্পু ব্যবহার করা যায়, এবং কাপড় ধোঁয়া যায়। মূলত পুকুরের পানি স্বচ্ছ রাখতেই এমন ব্যবস্থা। এছাড়াও মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও প্রয়োজনীয় জিনিস রাখার জন্য লকার ভাড়া নিতে হলে আপনাকে গুনতে হবে দশ টাকা।

নবাববাড়ি পুশকুনি বা গোল তালাবের দেখভালের দায়িত্বে আছে মৌলভী খাজা আব্দুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। নবাববাড়ি অ্যাংলিং কমিটির সহ-সভাপতি খাজা মো. ওয়াসেফ বলেন, ‘অনেক দূর থেকে এখানে মানুষ আসে। আমরা তাদের আনন্দের সঙ্গে এখানে আসতে বলি। ঘুরে দেখাই। ছবি তুলতে বলি। তাদের পানিতে নেমে গোসল করতে বলি। তাদের কাছে এটা একটা আশ্চর্য। এটাই আসলে আমাদের ঐতিহ্য। ঢাকা শহরে এরকম পুকুর পাওয়া তো এখন আর সম্ভব না। তবুও আমরা এটাকে বাঁচিয়ে রেখেছি।’

বিশেষ আকৃতির কারণে এ পুকুরটির নাম হয় গোল তালাব। পুকুরের পাড়ের অর্ধশত নারিকেল গাছ শোভা বাড়িয়েছে। প্রায় দুইশত বছর আগে কুমার সম্প্রদায়ের লোকেরা এখান থেকে মাটি কাটতো। যার ফলে সৃষ্ট হওয়া গর্ত থেকে এক সময় তৈরি হয়ে এ পুকুরটি। জনশ্রুতি আছে, ১৮৮২ সালের দিকে নতুন করে এ পুকুর খনন করা হয়।

‘নবাববাড়ি পুশকুনি’ ওরফে ‘গোল তালাব’ |ছবি: এখন টিভি

সে সময় ঢাকার নবাবরা অবসর সময় কাটাতে এখানে আসতেন এবং মাছ শিকার করতেন। সে ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে নবাবের বংশধরেরা। মাসখানেক পর পরই এখানে মাছ ধরার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

অনেকে এখানে এসে খুঁজে পান শৈশবের স্মৃতি। ভর করে পুরোনো আবেগ। ইট-কাঠের ঠাসবুনটের এ শহরে গোল তালাব বা নবাববাড়ি পুশকুনি যেন এক টুকরো মরূদ্যান।

এএইচ