বিশ্বে প্রথম এআইয়ের সহায়তায় মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার; সফলভাবে টিউমার অপসারণ

ন্যাশনাল হাসপাতাল ফর নিউরোলজি অ্যান্ড নিউরোসার্জারিতে অস্ত্রোপচার করছেন অধ্যাপক হানি মার্কাস ও ড্যানিয়াল খান
তথ্য-প্রযুক্তি
বিদেশে এখন
0

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটিয়ে বিশ্বে প্রথমবারের মতো সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির রিয়েল-টাইম সহায়তায় মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতালের (ইউসিএলএইচ) চিকিৎসকেরা এআইয়ের মাধ্যমে ৪৮ বছর বয়সী এক রোগীর মস্তিষ্ক থেকে জটিল এক টিউমার অপসারণ করেছেন। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অস্ত্রোপচার হওয়া ওই রোগীর নাম রিস হিবার্ট। বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা ও দুই সন্তানের জনক হিবার্ট কাস্টমার সার্ভিসেস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। ১৮ মাস আগে হঠাৎ হাঁটতে হাঁটতে অচেতন হয়ে পড়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, তার মাথার খুলির নিচে পিটুইটারি গ্রন্থিতে ১১ মিলিমিটারের একটি টিউমার বা ক্যানসারহীন অর্বুদ রয়েছে। এই টিউমারটি তার চোখের অপটিক নার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল, যার ফলে তিনি দৃষ্টিশক্তি ও শারীরিক ভারসাম্য হারাতে বসেছিলেন।

জটিল এই অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর নাকের ভেতর দিয়ে একটি সরু এন্ডোস্কোপ ক্যামেরা প্রবেশ করানো হয়। সংবেদনশীল পিটুইটারি গ্রন্থির আশপাশেই মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ ক্যারোটিড ধমনি এবং দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু অবস্থান করে। মানুষের শারীরিক গঠনভেদে ধমনির অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় অস্ত্রোপচারে সামান্য ভুলেও ধমনি কেটে যাওয়ার ০.৫ থেকে ২ শতাংশ এবং পুরোপুরি টিউমার অপসারণ না হওয়ার ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ ঝুঁকি থেকে যায়।

এই ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকেরা একটি রিয়েল-টাইম এআই টুল ব্যবহার করেন। এআই প্ল্যাটফর্মটি অস্ত্রোপচারের ভেতরের দৃশ্যটি একটি দ্বিতীয় স্ক্রিনে সরাসরি বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকদের যন্ত্রপাতির গতিবিধি ট্র্যাক করে। একই সঙ্গে হাড় ও ঝিল্লির পেছনে আড়ালে থাকা রক্তনালি ও স্নায়ুগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করে কোথায় আঘাত করলে রোগী সবচেয়ে নিরাপদ থাকবেন, সেই সংকেত দিতে থাকে।

ইউসিএলএইচ-এর অধ্যাপক হানি মার্কাস বলেন, একজন সার্জন তার পুরো জীবনে যতগুলো অস্ত্রোপচার করেন, তার চেয়েও অনেক বেশি ভিডিও ডেটা দিয়ে এই এআই সিস্টেমটিকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এটি অস্ত্রোপচার কক্ষে একজন অভিজ্ঞ সার্জনের মতো ‘দ্বিতীয় জোড়া চোখ’ হিসেবে কাজ করে। তবে এআই প্রযুক্তি কেবল পরামর্শক হিসেবে কাজ করে এবং মূল অস্ত্রোপচারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ডাক্তারদের হাতেই থাকে।

জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (এনআইএইচআর) ও সার্চ ইঞ্জিন গুগল-এর অর্থায়নে কয়েক বছর ধরে ল্যাবে পরীক্ষার পর এই প্রযুক্তিটি প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে সফলভাবে প্রয়োগ করা হলো। ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের সাহায্যার্থে তারা ‘সার্জিক্যাল চ্যাটজিপিটি’ তৈরির পরিকল্পনা করছেন।

অস্ত্রোপচারের আট সপ্তাহ পর রোগী রিস হিবার্ট পুরোপুরি সুস্থ বোধ করছেন। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের পর চোখ মেলেই আমার মনে হয়েছে আমি ৩৬০ ডিগ্রি কোণে সবকিছু দেখতে পাচ্ছি। বিগত এক বছর আমি এত পরিষ্কার দেখিনি। এই প্রযুক্তি আমাকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।’

এএম