আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক ডেটা বা ইন্টারনেট ট্রাফিকের ৯৯ শতাংশের বেশি পরিবাহিত হয় সমুদ্রের তলদেশের কেবলের মাধ্যমে। সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ কিলোমিটার সাবমেরিন কেবল বিস্তৃত রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল কেবল প্রটেকশন কমিটির হিসাবে, প্রতিবছর নানা কারণে প্রায় ২০০টি কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে ইচ্ছাকৃতভাবে কেবল কেটে ফেলার হুমকি তৈরি হলে সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা থাকে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে কেবল ও স্যাটেলাইটের মধ্যে পার্থক্য বিশাল। উদাহরণ হিসেবে, একটি আধুনিক সাবমেরিন কেবলের সক্ষমতা যদি প্রতি সেকেন্ডে ২০ টেরাবিট (টিবিপিএস) বা ২০ হাজার গিগাবিট (জিবিপিএস) হয় এবং একটি ব্যাকআপ স্যাটেলাইট লিংকের গতি যদি ১ জিবিপিএস হয়, তবে সেই স্যাটেলাইট লিংকটি সাবমেরিন কেবলের মোট ক্ষমতার মাত্র শূন্য দশমিক ০০৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। ফলে একটি মাত্র ২০ টিবিপিএস কেবলের পুরো ডেটা সামলাতে ২০ হাজার স্যাটেলাইট লিংক একসঙ্গে পূর্ণ ক্ষমতায় সচল রাখতে হবে। বাস্তবে কোনো স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের কার্যকর গতি নির্ভর করে তার ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রাম, গ্রাউন্ড স্টেশন এবং নির্দিষ্ট সময়ে কতজন গ্রাহক নেটওয়ার্কটি ব্যবহার করছেন তার ওপর।
সমুদ্রের তলদেশের কোনো কেবল বিচ্ছিন্ন হলে সাধারণত কোনো দেশ পুরোপুরি ইন্টারনেটহীন হয়ে পড়ে না। কারণ অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলে ট্রাফিক তাৎক্ষণিকভাবে অন্য কেবলের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া যায়। তবে আসল বিপদ দেখা দেয় যখন একাধিক কেবল একসঙ্গে অকেজো হয়ে পড়ে কিংবা একটি দেশ হাতে গোনা কয়েকটি সংযোগের ওপর নির্ভরশীল থাকে। আবহাওয়া ও বিশেষায়িত জাহাজের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে গভীর সমুদ্রের ক্ষতিগ্রস্ত কেবল মেরামত করতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সচল রাখতে পারে স্যাটেলাইট।
স্টারলিংকের মতো লো-আর্থ-অরবিট স্যাটেলাইট ব্যবস্থা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোবাইল টাওয়ার ভেঙে পড়লে, প্রত্যন্ত দ্বীপ বা বিচ্ছিন্ন জনপদে, সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজ ও বিমানে জরুরি বার্তা পাঠানো এবং সীমিত ডেটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। তবে পুরো দেশের কোটি কোটি মানুষের উচ্চগতির ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের মতো বিপুল ডেটা পরিবহনে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। এছাড়া সাধারণ মুঠোফোনে সরাসরি স্যাটেলাইট সংযোগ পাওয়ার প্রযুক্তি সীমিত ডেটা বা বার্তা আদান-প্রদানে সক্ষম হলেও তা ঘরে ঘরে ব্রডব্যান্ড ফাইবার অপটিক কেবলের সমতুল্য গতি দিতে পারে না।
এদিকে নিজেদের সেবার পরিধি বাড়াতে তৎপরতা জোরদার করেছে স্পেসএক্স। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮০ হাজার সেল টাওয়ার ব্যবহারের সুযোগ পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে তারা। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশজুড়ে মূলধারার মোবাইল অপারেটরগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে পারবে স্টারলিংক। পাশাপাশি ভবনের দেয়াল ভেদ করে সহজে নেটওয়ার্ক পৌঁছানোর জন্য ৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম কেনার উদ্যোগও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে সাবমেরিন কেবল ও স্যাটেলাইট মূলত পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক ডেটা স্থানান্তরের জন্য সাবমেরিন কেবল, দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অপটিক্যাল ফাইবার ও মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং জরুরি পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক ব্যাকআপ হিসেবে স্যাটেলাইটের সমন্বিত রূপই বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল যোগাযোগ সচল রাখার একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান।
—গ্লালফ নিউজের প্রতিবেদন অবলম্বনে





