হার না মানা লুলার গল্প

লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা
বিদেশে এখন
0

শৈশবে রাস্তায় বাদাম বিক্রি আর মানুষের জুতো পালিশ করে যার দিন কাটত, অভাবের তাড়নায় ১০ বছর বয়সে যিনি প্রথম বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সেই মানুষটিই আজ লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ব্রাজিলের শীর্ষ নেতৃত্বে। তিনি লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা। এক হতদরিদ্র শ্রমজীবী থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার তার এই অবিশ্বাস্য জীবনসংগ্রাম হার মানায় যেকোনো চলচ্চিত্রের গল্পকেও। কারখানার যন্ত্রে বাঁ হাতের আঙুল হারানো এক সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে ক্যানসার জয় এবং দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘ কারাবাস পেরিয়ে ৮০ বছর বয়সেও তিনি কোটি কোটি মানুষের আশা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

ব্রাজিলের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিরক্ষর ও ভূমিহীন কৃষক পরিবারে জন্ম লুলার। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে অল্প বয়সেই তাকে নামতে হয়েছিল জীবনযুদ্ধে। ভাগ্যান্বেষণে সাও পাওলোর একটি ধাতব কারখানায় লেদ মেশিনের কাজ শেখেন। ১৯৬০-এর দশকে কারখানায় কাজ করার সময় ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনায় বাঁ হাতের কনিষ্ঠাটি হারান তিনি। এই ক্ষত তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি, বরং শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনা ও অবহেলাকে তিনি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেন। সেখান থেকেই তার ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া।

সত্তরের দশকে প্রায় এক লাখ শ্রমিকের আস্থা অর্জন করে তিনি ইউনিয়ন নেতা নির্বাচিত হন এবং অনুগত শ্রমিক সংগঠনগুলোকে রূপান্তরিত করেন অধিকার আদায়ের এক অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনে। ১৯৮০ সালে মেহনতি মানুষ, বুদ্ধিজীবী ও অধিকারকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন দেশের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি।

লুলার জন্য মসনদের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর আগে টানা তিনবার জাতীয় নির্বাচনে তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু অদম্য মনোবলের জোরে ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সফল সমাজকল্যাণ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। সাড়ে চার কোটির বেশি মানুষকে তিনি সরাসরি দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে টেনে তোলেন। আট বছর সফলভাবে দেশ পরিচালনার পর রেকর্ড ৮৩ শতাংশ আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা নিয়ে বিদায় নেন তিনি। তবে ক্ষমতা ছাড়ার পরপরই তার জীবনে নেমে আসে ব্যক্তিগত দুর্যোগ। গলায় বাসা বাঁধে প্রাণঘাতী ক্যানসার। নিজের আইকনিক মুখভরা দাঁড়ি কামিয়ে ফেলে দীর্ঘ চিকিৎসার পর অদম্য সাহসে ২০১২ সালে ক্যানসারমুক্ত হন এই রাজনীতিক।

তবে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি আসে ২০১৭ সালে। বিতর্কিত এক অভিযানে শীর্ষ পর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগে তাকে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা ছাড়া টানা ৫৮০ দিন কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছিল তাকে। লুলা বরাবরই দাবি করে আসছিলেন যে তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

অবশেষে ২০২১ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট তার সাজা বাতিল ঘোষণা করলে মুক্তির স্বাদ পান তিনি। কারামুক্ত হয়েই সবাইকে চমকে দিয়ে ২০২২ সালের নির্বাচনে ডানপন্থী প্রবল হাওয়াকে প্রতিহত করে জয় ছিনিয়ে আনেন। এরপর ৮০ বছর বয়সে আবারও নাটকীয়ভাবে জয়ী হয়ে দেশের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি।

রাজনীতি ও বৈশ্বিক কূটনীতিতেও তার রয়েছে অনমনীয় তেজ। পরাশক্তিগুলোর প্রভাবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে ব্রাজিল কারও পেছনের উঠোন হতে পারে না এবং তিনি বিশ্বের কোনো নেতাকেই সবকিছুর দণ্ডমুণ্ডের কর্তা মনে করেন না। দারিদ্র্য, রোগব্যাধি আর বন্দিত্বের পাহাড় ডিঙিয়ে বারবার বিজয়ী হয়ে ফেরা লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা এখন কেবল এক রাষ্ট্রনায়ক নন, বরং হার না মানা এক মানবজীবনের জীবন্ত প্রতীক।

—বিবিসির প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম