ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ: কূটনৈতিক অগ্রগতির আড়ালে নতুন সংকটের সংকেত

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
বিদেশে এখন
0

ভারত ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার আপাত ইঙ্গিত মেলার পরই অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তে চীনা বাহিনীর নতুন করে অনুপ্রবেশের তথ্যে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ফের বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ভারতের ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) প্রধানের এক মন্তব্যে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর নয়াদিল্লির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

সীমান্তে নতুন করে কী ঘটেছে?
ভারতের রাজস্থানে সম্প্রতি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে আইটিবিপির মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুর জানান, চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের বেশ কয়েকটি বিরোধপূর্ণ পয়েন্টে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। প্রাথমিক উত্তেজনার পর উভয় পক্ষ পিছু হটলেও কয়েক দিন পর চীনা সেনারা অনেক বেশি শক্তি নিয়ে ফিরে আসে। তারা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) হিসেবে ভারত যে সীমানা দাবি করে, তার প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে বেশ কয়েকটি তাঁবু গেড়ে অবস্থান নেয়।

নয়াদিল্লির রাজনীতিতে কেন তীব্র বিতর্ক?
ভারতের মতো দেশে দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কোনো নিরাপত্তা কর্মকর্তার মুখ থেকে এমন স্পর্শকাতর তথ্য সরাসরি প্রকাশ পাওয়ার ঘটনা বিরল। সাধারণত প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব স্পর্শকাতর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কাপুরের এমন বক্তব্যের পর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর সমালোচনা শুরু করেছে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা জয়রাম রমেশ অভিযোগ করেছেন, এত বড় জাতীয় সংকট এবং ভূখণ্ডে অনধিকার প্রবেশের তথ্যের পরও প্রধানমন্ত্রী ও তার পুরো দপ্তর সম্পূর্ণ নীরব থেকে বেইজিংকে কূটনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে।

ভারত ও চীন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কী?
আইটিবিপি প্রধানের দেয়া তথ্য সরাসরি অস্বীকার করেনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, চীনা সেনারা তাদের প্রতিষ্ঠিত টহল সীমানা থেকে সরে এলে মাঝেমধ্যেই সীমান্তে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তবে সামরিক ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে দুই দেশই বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা সব দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা কঠোরভাবে মেনে চলে এবং নিজ ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় স্বাভাবিক টহল ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি কি থমকে গেল?
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা এবং ৪ চীনা সেনা নিহতের পর দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। কয়েক দফা আলোচনার পর সম্প্রতি উভয় দেশ সরাসরি বিমান চলাচল চালু এবং ভিসা প্রক্রিয়া শিথিলসহ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটছিল। এমনকি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে সাত বছর পর ভারত সফরও করেন। কিন্তু সীমান্তে সেনা অবস্থানের সাম্প্রতিক তথ্য প্রমাণ করছে যে সম্পর্কের এই আপাত স্বাভাবিকতা কতটা ভঙ্গুর। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং বড় কোনো যুদ্ধে না জড়ালেও সীমান্তে নিজেদের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নতুন ভৌগোলিক বাস্তবতা তৈরির কৌশল বজায় রেখেছে।

অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ কতটা জটিল?
সীমান্ত বিরোধ সত্ত্বেও চীনের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এখনও ব্যাপক। গত বছর দুই দেশের মোট ১৫১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের মধ্যে ১৩১ বিলিয়ন ডলারই ছিল চীনা পণ্যের আমদানি। বিশেষ করে ওষুধ শিল্প, ভারী যন্ত্রপাতি এবং বিদ্যুৎচালিত গাড়ির ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের জন্য ভারতকে চীনের মুখাপেক্ষী হতে হয়। এছাড়া বেইজিং সম্প্রতি মেট্রো ও মহাসড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত বিশেষ খননযন্ত্র রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় ভারতের অবকাঠামো প্রকল্পগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য নীতি নিয়েও নয়াদিল্লিতে উদ্বেগ রয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বোঝাপড়া জোরদার হলে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে যেকোনো সীমান্ত সংঘাতে ওয়াশিংটন ভারতের পাশে কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে, তা নিয়ে কৌশলগত মহলে সংশয় বাড়ছে।

—বিবিসির প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম