পাসের অপেক্ষায় গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
দেশে এখন
0

আগামীকাল ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। গুম বা ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ বন্ধ, অতীতের গুমের ঘটনা তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার।

এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদে ইতোমধ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপিত হয়েছে, যা এখন পাসের অপেক্ষায় রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে বিলটি উত্থাপন করেন। পরে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন তিনি। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিলটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন।

প্রস্তাবিত আইনে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক অথবা সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, সমর্থন বা সম্মতিতে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা অন্য কোনোভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর ঘটনাটি অস্বীকার করা কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন রাখাকে ‘গুম’ হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিলে গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তির অন্যূন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ভুক্তভোগী মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় নিখোঁজ থাকার পরও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অন্যূন পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।

গুমের সাক্ষ্যপ্রমাণ জেনেশুনে বিনষ্ট, গোপন, বিকৃত বা পরিবর্তন করলে অন্যূন পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একইভাবে গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ, স্থাপন বা ব্যবহার করলে অন্যূন পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে ব্যাপক বা পরিকল্পিত পদ্ধতিতে সংঘটিত গুমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীন মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারযোগ্য করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া গুম প্রতিরোধ, অপরাধের তদন্ত ও বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষায় একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী বা হুইসেলব্লোয়ার এবং ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার, ঘটনার প্রকৃত সত্য জানার এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র এ ব্যয় বহন করবে।

নিখোঁজ ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য তার সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির সুবিধার্থে নিখোঁজ ব্যক্তির সনদ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের ঘটনা নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রয়েছে। তদন্ত ও বিচার-উভয় কার্যক্রম সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে প্রস্তাবিত আইনে গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়নি। এ ধরনের মামলার তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে, বর্তমান সরকার অতীতে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বেআইনিভাবে গুমের শিকার না হন, সে লক্ষ্যে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য এ আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। প্রস্তাবিত আইনটি গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে।

বিশ্ব গুম দিবসের প্রাক্কালে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপনকে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে সরকারের আইনি উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন এবং পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষে বিলটি পাস হলে গুম প্রতিরোধ, তদন্ত ও বিচার এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি পৃথক আইনগত ভিত্তি তৈরি হবে।—বাসস

এএইচ