সহিহ বুখারির (Sahih Bukhari) ৯৬৯ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের নেক আমল আল্লাহর নিকট বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রিয় ও সওয়াবের।’ নিচে এই বরকতময় সময়ের বিশেষ ১৫টি আমল এবং ঈদের নামাজের নিয়ম বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো:
আরও পড়ুন:
জিলহজ মাসের শ্রেষ্ঠ ১৫টি আমল (15 Virtuous Deeds of Dhul Hijjah)
১. তওবা ও ইস্তিগফার করা (Repentance and Forgiveness): জিলহজ যেহেতু গুনাহ মাফের মাস, তাই বিগত জীবনের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে তওবা করা উচিত। পবিত্র কোরআনের সুরা হুদের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তাঁর কাছেই ফিরে এসো। নিশ্চয়ই তোমার রব অতি দয়ালু ও অধিক মমতাময়।’
২. জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা (Fasting First 9 Days of Dhul Hijjah): হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখতেন। সুনানে আবু দাউদের (Sunan Abu Dawood) বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশকের রোজা (১০ তারিখ ব্যতীত) কখনো পরিত্যাগ করেননি।
৩. আরাফার দিনের রোজা (Fasting on the Day of Arafah): ৯ জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনটি বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ। সহিহ মুসলিমের (Sahih Muslim) হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে তিনি এর মাধ্যমে বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’
৪. চুল ও নখ না কাটা (Not Cutting Hair and Nails): জিলহজ মাসের অন্যতম সুন্নত আমল হলো চাঁদ দেখা দেওয়ার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিজের নখ, চুল বা গোঁফ না কাটা। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, যখন তোমরা জিলহজ্বের চাঁদ দেখবে, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোরবানি (Qurbani) করবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। যারা কোরবানি দিতে পারছেন না, তারাও এই আমলটি করলে কোরবানির সওয়াব হাসিল করবেন ইনশা আল্লাহ।
আরও পড়ুন:
৫. অধিক পরিমাণে জিকির করা (Remembrance of Allah - Dhikr): সুরা হজের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, আয়াতে ‘নির্দিষ্ট দিন’ বলতে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনকেই বোঝানো হয়েছে।
৬. নেক আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া (Performing Good Deeds): এই দশকের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান হওয়ায় ফরজ ইবাদত সময়মতো আদায়ের পাশাপাশি নফল ইবাদতের (Nafl Ibadat) মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব।
৭. তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করা (Reciting Takbeer, Tahmeed and Tahlil): রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা এই ১০ দিনে তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবির (আল্লাহু আকবার) ও তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) বৃদ্ধি করো।’
৮. ওয়াজিব তাকবিরে তাশরিক আদায় করা (Takbeer-e-Tashreeq): ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত এই পাঁচ দিন মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ বলা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব (Wajib)। তাকবিরটি হলো ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’
৯. দোয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করা (Supplication - Dua): দোয়া হলো ইবাদতের মূল। জিলহজ মাসের প্রথম নয় দিন যারা রোজা রাখবেন, তাদের জন্য ইফতারের পূর্বমুহূর্ত দোয়া কবুলের (Dua Acceptance) এক বিশেষ সময়।
১০. সামর্থ্যবান হলে হজ করা (Performing Holy Hajj): হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। সহিহ বুখারির হাদিস অনুযায়ী, ‘মাবরুর হজ তথা কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’
১১. সামর্থ্য থাকলে কোরবানি করা (Animal Sacrifice for Allah): কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহান ওয়াজিব ইবাদত। জামে তিরমিজির (Jami at-Tirmidhi) হাদিস অনুযায়ী, কোরবানির দিনে পশু কোরবানি করার চেয়ে অন্য কোনো আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় নয় এবং পশুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়।
আরও পড়ুন:
১২. আত্মীয়তার সম্পর্ক জোরদার করা (Maintaining Family Ties): ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি করে। এই বন্ধন মজবুত করার লক্ষ্যেই কোরবানির গোশতের একটি অংশ আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব।
১৩. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা (Abstaining from Sins): পবিত্র এই দিনগুলোতে ইবাদতের সওয়াব যেমন বেশি, গুনাহে লিপ্ত হওয়াও তেমনি ভয়াবহ। সুরা আনআমের ১২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ প্রকাশ্য ও গোপন সকল গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
১৪. সৎ কাজের প্রতিযোগিতা করা (Competing in Good Deeds): এই মহিমান্বিত দিনগুলোতে মুমিনদের উচিত দান-সদকা, অসহায়কে সাহায্য এবং দ্বীনি কাজের মাধ্যমে কল্যাণমূলক কাজে প্রতিযোগিতা (Virtuous Competition) করা।
১৫. ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করা (Performing Eid-ul-Adha Prayer): ১০ জিলহজ শুকরিয়াস্বরূপ দুই রাকাত ঈদুল আজহার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা ওয়াজিব। ওজর না থাকলে এই নামাজ খোলা ময়দানে বা ঈদগাহে (Eidgah) আদায় করা সুন্নত।
ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের সঠিক নিয়ম (Rules of Eid Namaz Step by Step)
ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজে অতিরিক্ত ৬টি তাকবির দিতে হয়। এর নিয়মটি নিচে দেওয়া হলো:
প্রথম রাকাত: প্রথমে মনে মনে ঈদের নামাজের নিয়ত করে ইমামের সঙ্গে তাকবিরে তাহরিমা বেঁধে ছানা পড়তে হয়। এরপর ইমামের সঙ্গে অতিরিক্ত ৩টি তাকবির বলতে হয়; যার প্রথম ২ তাকবিরে হাত কান পর্যন্ত তুলে ছেড়ে দিতে হয় এবং ৩য় তাকবিরের পর হাত বাঁধতে হয়। এরপর ইমাম কিরাত পাঠ করে রুকু-সেজদার মাধ্যমে প্রথম রাকাত শেষ করবেন।
দ্বিতীয় রাকাত: দ্বিতীয় রাকাতেও যথারীতি কিরাত শেষে রুকুতে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত ৩টি তাকবির বলতে হয় এবং প্রতিবারই হাত কান পর্যন্ত তুলে ছেড়ে দিতে হয়। এরপর ৪র্থ তাকবির বলে সরাসরি রুকুতে যেতে হয় এবং বাকি নামাজ স্বাভাবিক নিয়মেই সম্পন্ন করতে হয়।
আরও পড়ুন:
একনজরে জিলহজ মাসের বিশেষ আমল ও সময়সূচি (Quick Guide: Dhul Hijjah Amall Schedule)




