আদিগন্ত সাদা বরফ আর রুক্ষ ধূসর পাথরের এক রহস্যময় সাম্রাজ্য গ্রিনল্যান্ড। বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটি মানচিত্রে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও, এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এখন আকাশচুম্বী। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা বিপুল ইউরেনিয়াম, খনিজ তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার দেখে আমেরিকাসহ বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো এখন এই বরফরাজ্যের দখল নিতে উন্মুখ। কিন্তু প্রায় দুই মিলিয়ন টন বরফ আর পাথরের এ নিথর সৌন্দর্যের আড়ালে মিশে আছে এক জীবন্ত আবেগ, যার নাম ফুটবল।
প্রতি বছর আগস্ট মাসে গ্রীষ্মকালে রাজধানী নুকে আয়োজন করা হয় গ্রিনল্যান্ড ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের। এই টুর্নামেন্টে অংশ নিতে দলগুলোকে যে অদম্য কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়, তা অবিশ্বাস্য। কোনো কোনো দলকে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে টানা দুই দিন নৌকায় করে আসতে হয় মূল আসরে। এমনকি রাজধানীতে থাকার খরচ আকাশছোঁয়া বলে ফুটবলাররা ছোট ছোট কোয়ার্টারে একই রুমে গাদাগাদি করে চাটাই বিছিয়ে রাত কাটান, কেবল মাঠের লড়াইয়ে নামার নেশায়।
আরও পড়ুন:
টুর্নামেন্টের দলগুলোর নামও এই দ্বীপের মতোই অদ্ভুত আর যান্ত্রিক। যেমন জি-৪৪, বি-৬৭ কিংবা আিইটি-৭৯। বর্তমানে এ ফুটবল লড়াই আধুনিক কৃত্রিম ঘাস বা আর্টিফিশিয়াল টার্ফে হলেও, মাত্র এক দশক আগেও চিত্রটা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৫৪ সালে শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত খেলোয়াড়রা লড়েছেন ধারালো নুড়ি আর কাদামাটির মাঠে। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, প্রথমার্ধের খেলা শেষে মাঠের সীমানা আর পেনাল্টি এরিয়ার দাগ পুরোপুরি মুছে যেত। যা বিরতির সময় আয়োজকদের আবার নতুন করে এঁকে নিতে হতো।
মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এখানকার গ্যালারি বা দর্শকদের উন্মাদনাও এক অতিপ্রাকৃত আবহ তৈরি করে। প্রথাগত স্টেডিয়াম না থাকায় দর্শকরা অনেকে পাহাড়ের উঁচু পাথরের খাঁজে বসে খেলা উপভোগ করেন। আবার অনেকে খেলা দেখেন নিজেদের গাড়িতে চড়ে। যখনই কোনো দল গোল করে, পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে শত শত গাড়ির হর্নের শব্দে। বর্তমানে বি-৬৭ দলটি সবচেয়ে বেশি ১৫ বার শিরোপা জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে।
দ্বীপটির ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং চ্যানেলে যখন এ খেলাগুলো সম্প্রচার করা হয়, তখন পুরো গ্রিনল্যান্ড যেন এক সুতোয় গেঁথে যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একই পিচে প্রতিদিন চলে এ বল দখলের লড়াই। যেখানে জীবন মানেই হাড়কাঁপানো শীত আর পাথুরে নীরবতা, সেখানে এই ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে আসে প্রাণের স্পন্দন। বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা দ্বীপবাসীদের মাঝে ফুটবল এখানে হয়ে উঠেছে এক ভ্রাতৃত্বের ভাষা।





