সাংগ্রাই উদযাপনকে কেন্দ্র করে দুটি পৃথক পক্ষ আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করে একই সময়ে এবং একই স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয়ায় বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌছায়।
সাধারণত প্রতিবছর নববর্ষকে ঘিরে পাহাড়ের মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই উৎসব পালন করে থাকে। উৎসবের মূল আকর্ষণ মৈত্রী পানি বর্ষণ বা জলকেলি। এছাড়াও উৎসব উপলক্ষে পিঠা তৈরি, বয়স্ক পূজা, বুদ্ধ মূর্তি স্নানসহ তিন দিনব্যাপী নানা আনুষ্ঠানিকতা পালন করে মারমারা।
স্থানীয় রাজার মাঠে জাঁকজমকভাবে এ উৎসবের আয়োজন করে উৎসব উদযাপন পরিষদ। এবছরও উৎসব উদযাপন পরিষদ গত ১৮ মার্চ বর্ণাঢ্য আয়োজনে রাজার মাঠে সাংগ্রাই উৎসব পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। কিন্তু এর একদিন পর ১৯ মার্চ আরেক পক্ষ উৎসব উদযাপন কমিটি নামে আরেকটি সাংগ্রাই আয়োজনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এরপর থেকেই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব।
উৎসব উদযাপন পরিষদ নিজেদের বৈধ কমিটি ঘোষণা করে অন্যদিকে অপর পক্ষও নিজেদের বৈধ ঘোষণা করে। এছাড়াও সাংগ্রাই উদযাপনের জন্য রাজার মাঠ বরাদ্দের আবেদন করলে বোমাং সার্কেল চীফ উৎসব উদযাপন কমিটিকে মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তবে এটি মানতে নারাজ অন্য উৎসব উদযাপন পরিষদ। এর ফলে দুপক্ষের দ্বন্দ্ব আরো চরমে উঠে।
এরপর বিভিন্নভাবে স্থানীয় মারমা নেতৃবৃন্দরা আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয়নি। সবশেষ গত ৩ এপ্রিল সকালে উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি চনু মং মার্মা ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উৎসব আয়োজনকে ঘিরে রাজারমাঠ পরিদর্শন করেন এবং সাজ সজ্জার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
একই দিন সন্ধ্যায় অন্য উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি চথুই ফ্রু ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দরা রাজার মাঠ পরিদর্শনে গেলে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এসময় স্থানীয় সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীও সেখানে যান। পরে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়।
উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি চনু মং মারমা বলেন, ‘প্রতিবছরের ন্যায় এবারও সাংগ্রাই উদযাপনের জন্য আমরা উৎসব উদযাপন পরিষদ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। পূর্ব ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী সাংগ্রাই উপলক্ষে খেলাধুলার জন্য আমরা মাঠ প্রস্তুত করেছি। সন্ধ্যায় খবর পেলাম উৎসব উদযাপন কমিটি মাঠে গিয়েছে এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যও সেখানে দল বল নিয়ে মাঠে এসেছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম আমাদের কয়েকটা পতাকা তুলে ফেলা হয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে মাঠ ছেড়ে যেতে বললে আমরা চলে আসি।’
কমিটি ও মাঠ ব্যবহারের অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাংগ্রাইয়ের দুই বছরের কমিটি আমাদেরটা। আমাদের না বলে তারা নিজেরা একটা কমিটি করেছে এটা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আর মাঠ ব্যবহারের বিষয়ে কাউকেই অনুমতি দেয়া হয়নি। এর আগে কখনো মাঠ ব্যবহারের জন্য অনুমতি নেয়ার দরকার হয়নি। প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই আমরা অনুষ্ঠান করেছি। তবে এটি আমাদের সামাজিক উৎসব তাই আমরা চাই সবাই মিলে মিশে এ উৎসব পালন হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তৃতীয় একটি পক্ষ সমঝোতার জন্য চিঠি দিয়েছে আমরা সেটাতে রাজী হয়ে উত্তর দিয়েছি কিন্তু আর কোন বৈঠক হয়নি। যদি কোনো বৈঠক হয় আমরা সেখানে যেতে রাজী আছি কিন্তু তারা সেখানে বসতে রাজী নয়।’
এ বিষয়ে উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি চথুই ফ্রু বলেন, ‘উৎসব উদযাপনকে ঘিরে মাঠের প্রস্তুতির জন্য ৩ তারিখ আমরা মাঠ পরিদর্শনে যাই সেখানে আমাদের প্রস্তুতি দেখতে এমপি সাহেবও আসেন। খবর পেয়ে সেখানে উৎসব উদযাপন পরিষদের চনু মং রা কয়েকজন মাঠে আসে। খবর পেয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছুটে আসে। পরে আমরা সেখান থেকে চলে আসি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উৎসব উদযাপন কমিটি মাঠ ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছি তাই আমরা মাঠে অনুষ্ঠান করবো। অন্যান্য বারের চেয়ে এবার আরও বর্ণাঢ্য আয়োজনে সাংগ্রাই আয়োজন করা হবে। সব জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সাংগ্রাই উৎসব উদযাপিত হবে। ৮ তারিখ থেকে আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হবে সে লক্ষ্যে সব প্রস্তুতি চলছে।’
কমিটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, মারমা সমাজের মানুষজন বসে উৎসব উদযাপনের জন্য একটি কমিটি তৈরি করে। সেখানে অং চ মং কে সভাপতি করা হলেও উনি অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে সবাই আমাকে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করে। স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজে এ কমিটিকে সব ধরনের সহযোগিতা করছে যাতে একটি সুন্দর আয়োজন করা হয়। অন্য কেউ যদি অন্য কোনো কমিটির মাধ্যমে সাংগ্রাই পালন করতে চায় তাহলে তারা অন্য কোনো জায়গায় করবে এতে আমাদের সমস্যা নেই। তবে আমরা চাই সবাইকে নিয়ে মিলে মিশে সাংগ্রাই উদযাপন করতে।’
এ বিষয়ে উৎসব উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি ও জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচ মং মারমা বলেন, সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন নিয়ে দুটি কমিটি হওয়ায় উৎসব পালন নিয়ে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি একটা সমাধানের জন্য। না হলে এটা আমাদের মারমা সমাজে একটা বিভেদ সৃষ্টি করবে। আমরা উদ্যোগ নিয়েছি একপক্ষ এতে সারা দিয়েছে অন্য একটি পক্ষ এতে সারা না দেয়ায় আমরা বসতে পারছি না। তবে আশা করি এটা একটা সমাধান হয়ে যাবে।’
উল্লেখ্য উৎসব উদযাপনের কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব নিরসনে উভয় পক্ষকে নিয়ে ৫ এপ্রিল স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।





