৩৫ কাঠুরিয়া হত্যার ৩ দশক; এখনো বিচার ও পুনর্বাসনের অপেক্ষায় স্বজনরা

৩৫ কাঠুরিয়া হত্যার গণকবর
এখন জনপদে
0

৯ সেপ্টেম্বর রাঙামাটির লংগদুর ৩৫ কাঠুরিয়া হত্যাকাণ্ড দিবস। ১৯৯৬ সালের এ দিনে লংগদু উপজেলার পাকুয়াখালীর গহিন বনে নিরস্ত্র ৩৫ কাঠুরিয়াকে হত্যা করে তৎকালীন উপজাতীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী শান্তিবাহিনী। এ হত্যাকাণ্ডের ৩০ বছর পার হলেও বিচার ও পুনর্বাসন না পেয়ে হতাশা আর মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন নিহতদের স্বজনরা। বর্বর এ হত্যাকাণ্ডের স্মরণে এখনো কেঁদে উঠেন লংগদুর মানুষ।

১৯৯৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর শান্তিবাহিনীর সদস্যরা আলোচনার জন্য পৃথকভাবে ডেকে নিয়ে যায় লংগদুর ৩৬ বাঙালি কাঠুরিয়াকে। সেখানে কাঠুরিয়াদের হাত-পা-চোখ বেঁধে, নির্যাতন চালিয়ে হত্যার পর মরদেহ পাহাড়ি খাদে ফেলে দেয়। সৌভাগ্যক্রমে ইউনুছ নামের এক কাঠুরিয়া প্রাণে বেঁচে পালিয়ে আসে। তার মাধ্যমে নৃশংস হত্যাযজ্ঞের খবর জেনে ৯ সেপ্টেম্বর পাকুয়াখালীর বন হতে কাঠুরিয়াদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সেই দিন শুধু ৩৫টি প্রাণই যায়নি, থেমে গিয়েছিল ৩৫টি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও। লংগদুর মানুষের কাছে ৯ সেপ্টেম্বর আজও এক রক্তাক্ত স্মৃতির অধ্যায়। তিন দশক পরও হয়নি হত্যাকাণ্ডের বিচার, বাস্তবায়ন হয়নি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতিও।

নিহতদের উপজেলা পরিষদের পাশে গণকবর দেয়া হয়। আজও সেই গণকবরের সামনে দাঁড়ালে স্বজনদের মনে ফিরে আসে ৩০ বছর আগের সেই ভয়াবহ দিন। তাদের একজন জোহরা বেগম, স্বজন হারিয়েও ৩০ বছরে পাননি হত্যার বিচার। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বাবা হারান আমির হোসেন, বড় হয়েছেন বাবার হত্যার গল্প শুনে।

স্বামী হারানো জহুরা বেগম বলেন, ‘ তাকে মেরে কু রুমের ভিতরে ফেলে রাখা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সবার মরদেহ উদ্ধার করে।’

আরও পড়ুন

বাবা হারান আমির হোসেন বলেন, ‘সবাই সবার বাবাকে দেখছে। দেখতে পেরেছে, বাবা ডাকতে পেরেছে। আমি কখনো আমার বাবাকে দেখতেও পারিনি, ডাকতেও পারিনি।’

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাঘাইছড়ি থানায় মামলা হলেও পরে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় সিআইডিকে। কিন্তু তিন দশকেও শেষ হয়নি তদন্ত। ফলে হত্যার বিচার তো হয়নি, পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতিও রয়ে গেছে কাগজে-কলমে।

স্বজন হারানোরা জানান, যারা হত্যা করছে তাদেরকে এখনো বিচারের আওতায় আনা হয়নি বলেন তারা।

এ গণহত্যার এক বছর পর ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের দৌরাত্ম্য ও প্রাণহানির ঘটনা আজও পুরোপুরি থামেনি।

রাঙামাটির লংগদু ৩৫ কাঠুরিয়া হত্যা স্মৃতি সংসদের আহবায়ক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে যারা এ পর্যন্ত হত্যার শিকার হয়েছে, অপহত্যার শিকার হয়েছে, সে বাঙালি হোক, পাহাড়ি হোক, মারমা হোক, ত্রিপুরা হোক, ভিন্ন— ভিন্ন কোনো ধর্মের, বর্ণে, গোত্রের হোক; আমরা প্রত্যেকটি অপহত্যার বিচার চাই।’

৩৫ কাঠুরিয়া হত্যার বিচার না হওয়া শুধু স্বজনদের ক্ষতই বাড়ায়নি, পার্বত্য অঞ্চলে আস্থা, নিরাপত্তা ও স্থায়ী শান্তির পথও কঠিন করে তুলছে। তাই অতীতের এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করে পাহাড়ে আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি স্থানীয়দের।

জেআর