সম্প্রীতির আবহে দুর্গোৎসবের অপেক্ষা; শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জ
শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে নারায়ণগঞ্জ
ধর্ম ও বিশ্বাস
এখন জনপদে
4

শরতের সাদা মেঘ, কাশফুল আর ঢাকের বাদ্যির অপেক্ষা, সব মিলিয়ে দুর্গোৎসবের আবহে সেজে উঠছে নারায়ণগঞ্জ। প্রতিমায় রঙের শেষ আঁচড়, পাশাপাশি পূজার কেনাকাটায় ব্যস্ত নগরবাসী। উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। তবে সবকিছুর মধ্যেই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—ধর্মীয় সম্প্রীতি অটুট রেখে শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপন।

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। চলছে প্রতিমায় রঙ ও অলংকারের কাজ। সবকিছুতেই এখন ব্যস্ত আয়োজকেরা। এ বছর নারায়ণগঞ্জ জেলায় ২৪০টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেবীপক্ষের সূচনা। ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হবে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। এবার দেবীর আগমন ঘোটকে আর গমন নৌকায়।

‘শারদীয় দুর্গাপূজা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। প্রতিটি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের বরাদ্দকৃত অনুদান সুষ্ঠুভাবে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, উৎসবের আনন্দে যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—সেদিকেই এবার সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রশাসনের। মণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি স্থাপন, জেলার পূজা কার্যক্রম সমন্বয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ, আনসার, এসআরবি, বিজিবি ও গোয়েন্দা সদস্যদের মাঠে রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপকেন্দ্রিক নিরাপত্তার পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে থাকবে বিশেষ টহল ও মোবাইল টিম।

নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান জানান, শুধু মণ্ডপের ভেতরের নিরাপত্তা নয়, উৎসবকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা অপতথ্য ছড়িয়ে যাতে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল না হয়, সেজন্যও নজরদারি রাখা হচ্ছে।

মণ্ডপের আশপাশে সাদা পোশাকে সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

শ্রী শ্রী বলদেব জিউড় আখড়া ও শিব মন্দিরের সভাপতি জয় কে রায় চৌধুরী জানান, পূজার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বরাবরের মতো এবারও নারায়ণগঞ্জে কোন শঙ্কা নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সব ধরনের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় আমরা সন্তুষ্ট। পূজার আয়োজন ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর। এখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করে আসছেন। আমরা আশা করি, এই সম্প্রীতি ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে।

নারায়ণগঞ্জের সনাতন ধর্মের সাধারণ নাগরিকরা মনে করেন, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যেরও প্রতিচ্ছবি।

মণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষের উপস্থিতি, শুভেচ্ছা বিনিময় ও সহযোগিতা তুলে ধরে বহুত্ববাদী এই জনপদের চিত্র। এদিকে উৎসবের প্রস্তুতি শুধু মণ্ডপেই নয়—ব্যস্ততা এখন নারায়ণগঞ্জের মার্কেটগুলোতেও।

পূজার দিনগুলোতে নতুন পোশাক পরার রীতি। তাই নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য পছন্দের পোশাক কিনতে দোকানে দোকানে ভিড় করছেন ক্রেতারা।

নারীদের পছন্দের তালিকায় শাড়ি। আর পুরুষদের নজর পাঞ্জাবিতে। শিশুদের জন্যও চলছে নানা রঙ ও নকশার পোশাক বাছাই। তবে পছন্দের পোশাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দামের চাপ—আক্ষেপ ক্রেতাদের।

বিপণিবিতান গুলোতে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতারা কেউ পূজার জন্য শাড়ি কিনছেন, আবার কেউ পাঞ্জাবি। নারী ক্রেতারা শাড়ির প্রতি আলাদা দুর্বলতার কথা বলেন। অনেকে নিজের ও পরিবারের জন্যও কেনাকাটা করছেন। তবে দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করছেন ক্রেতারা। অনেকটা আক্ষেপের সুরে ক্রেতারা বলেন, প্রতিবছরই আগের বছরের চেয়ে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। তারপরও বছরে একবার আসা পূজায় নিজের সক্ষমতার মধ্যে পরিবারের জন্য পছন্দ করে কেনাকাটা করেন সবাই।

অপরদিকে পুরুষ ক্রেতারা পূজায় পাঞ্জাবির প্রতি দুর্বলতার কথা জানান। নিজের পাঞ্জাবি কেনার পাশাপাশি পরিবারের সবার জন্যও কেনাকাটার কথা বলেন। এখানেও পছন্দের অনেক কিছুর কথা বললেও দাম নিয়ে আক্ষেপের সুর ছিল।

এদিকে বিক্রেতারা পূজাকে সামনে রেখে ভালো বেচাকেনার প্রত্যাশা করছেন। শেষ সময়ে ক্রেতার চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিক্রেতারা।

বেচাকেনা মোটামুটি হচ্ছে। ক্রেতা আসছেন, দেখছেন, কিনছেনও। তবে অনেকে দাম নিয়ে কথা বলছেন, দরদাম করছেন বলে জানান বিভিন্ন মার্কেটের দোকানদার।

এদিকে দাম বাড়লেও উৎসবের আনন্দে ভাটা দিতে চান না কেউই। সামর্থ্যের মধ্যে পছন্দের পোশাক কিনে পরিবার নিয়ে দুর্গোৎসব উপভোগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন নগরবাসী।

কেউ শাড়িতে খুঁজছেন পূজার নতুন সাজ, কেউ পাঞ্জাবিতে চান উৎসবের আমেজ। আর বিক্রেতারাও তাকিয়ে আছেন শেষ মুহূর্তের বিক্রির দিকে। মণ্ডপে মণ্ডপে এখন শুধু অপেক্ষা দেবীর আগমনের।

প্রতিমার চোখে প্রাণের অপেক্ষা, ঢাকের বাদ্যির প্রস্তুতি, আলোর ঝলকানি আর মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ! সব মিলিয়ে শারদীয় আবহে রঙিন হয়ে উঠছে নারায়ণগঞ্জ। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, উৎসবের আনন্দ আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনকে অটুট রেখে নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা একটাই শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দমুখর দুর্গোৎসব।

এএইচ