গ্যাস সংকটে বন্ধের মুখে বহু কারখানা: বিপাকে পোশাকখাতের ব্যবসায়ীরা

পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা
দেশে এখন , শিল্প-কারখানা
অর্থনীতি
0

তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে, দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা তৈরি পোশাকখাত। শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। বন্ধ হয়ে গেছে গ্যাসভিত্তিক জেনারেটর। যার প্রভাবে অনেক ডাইং কারখানা পুরোপুরি তালাবদ্ধ। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাসহ বিভিন্ন এলাকার উদ্যোক্তারা বলছেন, বিকল্প উপায়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। দ্রুত সংকট না কাটলে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চলছে না বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় জেনারেটর। তীব্র গ্যাস সংকটে চার সপ্তাহ ধরে নিস্তব্ধ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই বিশাল আকারের যন্ত্র। অধিকাংশ কারখানায় চাহিদার তুলনায় মিলছে না নামমাত্র গ্যাসও।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এই কারখানাটিতে বাধ্য হয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে বিকল্প উপায়ে। আর এতে কমেছে উৎপাদন, খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু এই কারখানা নয়, একই চিত্র অধিকাংশ ডাইং ইউনিটের। গ্যাসের চাপ না থাকায় এরই মধ্যে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে অনেক ডাইং কারখানা।

ফতুল্লাহ ডায়িংয়ের মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘এখন যেহেতু আমি আমার পাওয়ার চালালাম, সেখানে কিন্তু আমার বিদ্যুৎ বিল ভয়ঙ্কর আকারে আসবে এই মাসে। আমি এখনো বিল পাই নাই হাতে, কিন্তু আমাদের ইন্টারনাল সিস্টেমে আমরা যে ক্যালকুলেশন করে দেখলাম, বিদ্যুৎ বিল আমার চলে আসছে অলমোস্ট এবার যা আমাদের নরমাল মান্থে হয়, তার থেকে তিন গুণ বেশি অলমোস্ট আমার বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে।’

দীর্ঘদিন ধরেই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যেই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে ২১ জুলাই থেকে পোশাক খাতে তীব্র আকার ধারণ করে গ্যাস সংকট। এর প্রভাবে শুধু উৎপাদনই কমেনি এর প্রভাবে, বিলম্ব হচ্ছে পণ্য জাহাজীকরণে। ক্রয়াদেশ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ার পাশাপাশি, শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে এ খাতের ব্যবসায়ীদের।

শিল্প মালিকদের দাবি, এখন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তবে তার বড় মাশুল গুনতে হতে পারে জাতীয় অর্থনীতিকে।

গোল্ডেন স্টিচ ডিজাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোয়াদ্দার মো. হোসনে কামার আলম বলেন, ‘অ্যাট দ্য অ্যান্ড অফ দ্য মান্থ উই হ্যাভ টু পে আওয়ার ওয়ার্কার্স, উই হ্যাভ টু পে ব্যাংক ইনস্টলমেন্টস। বাট এটা কেউ চিন্তা করতেছে না যে আমার এনার্জিটা এনশিওরড না। আমাকে ডেলিভারি দিতে হবে। আমাকে আমার কাস্টমারের ডেলিভারি ডেট মেইনটেইন করতে হবে। আমি আজকে যে গ্যাসের কারণে আমার কারখানার জেনারেটর চালাইতে পারতেছি না, বয়লার চালাইতে পারতেছি না, আমি কিভাবে ডেলিভারি দিব? কিভাবে আমি উৎপাদন অব্যাহত রাখবো?’

পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, বর্তমানে খাতের গড় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ৪০ শতাংশেরও বেশি। সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন তারা। তবে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি বলছেন, উৎপাদন কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। দ্রুত সমস্যা সমাধান না করা গেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি চাপে পড়বে দেশের অর্থনীতি।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে এহসান শামীম বলেন, ‘এখনকার জ্বালানি সমস্যার কারণে আমাদের ৪০% হলো আমাদের হলো ক্যাপাসিটি, অর্থাৎ ৬০% এফিশিয়েন্সিতে আমরা প্রোডাকশন করছি। বারবার গ্যাসের কারণে আমাদের প্রোডাকশন ডিসরাপশন হচ্ছে, সময়মতো শিপমেন্ট করতে পারতেছি না। এটাতে করে বায়াররা আনকমফোর্টেবল সিচুয়েশনে যাচ্ছে। তখন বায়াররা হেসিটেট করছে যে বাংলাদেশের এই সমস্যা যদি ক্রনিক থাকে, তাহলে এখানে অর্ডার প্লেসমেন্ট না করে অন্য দেশে প্লেসমেন্ট করার চেষ্টা একটা অনেক বায়ারের চলে আসছে।’

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গাতে প্রায় ৫০, ৬০, ৭০% ও প্রোডাকশন হ্যাম্পার হচ্ছে। আর ৩০-৪০% তো প্রায় সব ফ্যাক্টরিতেই আমার প্রোডাকশন কম আছে। এটার কারণে আমি সময়মত কাপড় পাচ্ছি না। সময়মত কাপড় না পাওয়াতে আমি বায়ারের সাথে কমিটমেন্ট ঠিক রাখতে পারতেছি না। ফলে বায়াররা আবার সেখানে গুডসগুলো আমাকে তখন এয়ার করতে বলছে, এবং এয়ার করা মানে তো একটা হিউজ লস।’

পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে দেশের কোটি মানুষের জীবিকা। অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই মুহূর্তে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের কোনো বিকল্প দেখছেন না খাত সংশ্লিষ্টরা।

ইএ