দিনাজপুর বোর্ডে এইচএসসির ফলে বড় ধস, ৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাশের হার

শূন্য পাশ ৪৯ কলেজে

দিনাজপুর
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড
এখন জনপদে
শিক্ষা
0

দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। চলতি বছর পাশের হার নেমে এসেছে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাশের হার কমেছে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ। একইসঙ্গে অর্ধেকে নেমে এসেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে কলেজভিত্তিক ফলাফলেও। বোর্ডের ৬৬৮টি কলেজের মধ্যে ৪৯টিতে একজন শিক্ষার্থীও পাশ করতে পারেনি।

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত ‘একনজরে সাত বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান’ বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সাত বছরে পাশের হারে বড় পতন

বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া ১ লাখ ১১ হাজার ৭৮৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ৫১ হাজার ৩৯৮ জন। পাশের হার ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অথচ ২০২৫ সালে ১ লাখ ৮ হাজার ৬৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছিল ৬২ হাজার ৮৮২ জন। ওই বছর পাশের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাশের হার কমেছে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ। সংখ্যার হিসাবে পাশ করা শিক্ষার্থী কমেছে ১১ হাজার ৪৮৪ জন।

গত সাত বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালে পাশের হার ছিল ১০০ শতাংশ। ২০২১ সালে ৯২ দশমিক ৪৩, ২০২২ সালে ৭৯ দশমিক ০৮, ২০২৩ সালে ৭৪ দশমিক ৪৮, ২০২৪ সালে ৭৭ দশমিক ৫৬, ২০২৫ সালে ৫৭ দশমিক ৪৯ এবং ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে।

অর্থাৎ ২০২৪ সালে সামান্য উন্নতি ছাড়া সামগ্রিকভাবে পাশের হার নিম্নমুখী। ২০২৪ সালের তুলনায় চলতি বছরে পাশের হার কমেছে ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বিশেষ করে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে পরপর দু’বছর বড় ধরনের পতন হয়েছে।

জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে অর্ধেকের বেশি

পাশের হারের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ অর্জনেও বড় ধস দেখা গেছে। চলতি বছর বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯৫৩ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ১ হাজার ৩৮৩ জন এবং ছাত্রী ১ হাজার ৫৭০ জন।

গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬ হাজার ২৬০ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ৩০৭ জন বা প্রায় ৫৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ২৯৫। অর্থাৎ দু’বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭৯ শতাংশ কমেছে।

এ পরিসংখ্যান শুধু সামগ্রিক পাশের হার নয়, সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বড় ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ছাত্রীদের চেয়ে পিছিয়ে ছাত্ররা

ফলাফলে ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। চলতি বছর ছাত্রদের পাশের হার ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ। বিপরীতে ছাত্রীদের পাশের হার ৫০ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ পাশের হারে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ এগিয়ে।

জিপিএ-৫ অর্জনেও ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। মোট ২ হাজার ৯৫৩ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৫৭০ জন ছাত্রী এবং ১ হাজার ৩৮৩ জন ছাত্র।

গত বছরও ছাত্রদের পাশের হার ছিল ৫২ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ। সাত বছরের পরিসংখ্যানে ২০২০ সালে উভয়ের পাশের হার ১০০ শতাংশ থাকলেও অন্য বছরগুলোতে ছাত্রীদের পাশের হার ছাত্রদের চেয়ে বেশি।

এক ও দুই বিষয়ে অকৃতকার্য প্রায় ৪৭ হাজার

ফলাফলের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ৩২ হাজার ৪৫৯ জন। পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীর হিসাবে এ হার ২৯ দশমিক ০৪ শতাংশ।

অন্যদিকে দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ১৪ হাজার ২০৬ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

অর্থাৎ এক ও দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সম্মিলিত সংখ্যা ৪৬ হাজার ৬৬৫। পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪২ শতাংশ এই দুই শ্রেণিতে রয়েছে।

তুলনামূলক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিল ৬ হাজার ৫১৫ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিল ১ হাজার ৫৮৭ জন। চলতি বছর এ সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে।

এছাড়া চলতি বছর পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বহিষ্কৃত হয়েছে ৪২ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৭।

কলেজভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে কলেজভিত্তিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। চলতি বছর বোর্ডের ৬৬৮টি কলেজের মধ্যে মাত্র ছয়টি কলেজের সব শিক্ষার্থী পাশ করেছে। অথচ ২০২০ সালে শতভাগ পাশ করা কলেজের সংখ্যা ছিল ৬৫৭টি। ২০২১ সালে ৫৩টি, ২০২২ সালে ২৪টি, ২০২৩ সালে ১৩টি, ২০২৪ সালে ১৫টি এবং ২০২৫ সালে ১১টি কলেজের শতভাগ শিক্ষার্থী পাশ করেছিল।

অন্যদিকে চলতি বছর ৪৯টি কলেজে কোনো শিক্ষার্থীই পাশ করতে পারেনি। গত বছর শূন্য পাশ করা কলেজের সংখ্যা ছিল ৪৩টি। ২০২৪ সালে ছিল ২০টি, ২০২৩ সালে ১৬টি এবং ২০২২ সালে ১৩টি।

এছাড়া এক থেকে ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছে এমন কলেজের সংখ্যা ৪৩টি। ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পাশের হার রয়েছে ৪৬৪টি কলেজে। ৫০ থেকে ৯৯ শতাংশ পাশ করেছে ১০৬টি কলেজে।

অর্থাৎ বোর্ডের মোট কলেজের প্রায় ৭০ শতাংশেই পাশের হার ১০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। অন্যভাবে বললে, এসব প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশের বেশি পাশের হার রয়েছে মাত্র ১১২টি কলেজে। অথচ ২০২৪ সালে এ ধরনের কলেজের সংখ্যা ছিল ৫১৩টি। দু’বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা কমেছে ৪০১টি।

বিশেষ করে শতভাগ পাশ করা কলেজের সংখ্যা ২০২০ সালের ৬৫৭ থেকে কমে ছয়ে নেমে আসা এবং শূন্য পাশ করা কলেজের সংখ্যা বেড়ে ৪৯ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলের বৈষম্য ও মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পরীক্ষার্থী ও কলেজের সংখ্যা বাড়লেও ফল কেন নিম্নমুখী?

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় মোট নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৯১ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ১১ হাজার ৭৮৭ জন। অনুপস্থিত ছিল ৩ হাজার ৭০৪ জন। পরীক্ষা নেয়া হয়েছে ২১৩টি কেন্দ্রে। কলেজের সংখ্যা ৬৬৮টি। গত বছর কলেজের সংখ্যা ছিল ৬৬৬টি এবং কেন্দ্র ছিল ২১৩টি।

অর্থাৎ পরীক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মোটামুটি একই পর্যায়ে থাকলেও ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। তাই শুধু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধিকে এ ফলাফলের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন, প্রয়োজন কারণ অনুসন্ধান

সাত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সামগ্রিক অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের পর থেকে পাশের হার, জিপিএ-৫ এবং ভালো ফল করা কলেজের সংখ্যা দ্রুত কমেছে। বিপরীতে শূন্য পাশ ও নিম্ন পাশের হার থাকা কলেজের সংখ্যা বেড়েছে।

দিনাজপুর সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আব্দুল জলিল বলেন, ‘এ পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মান, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ফল বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।’

শিক্ষাবিদদের মতে, ফলাফলের এই অবনতি কেন ঘটছে, তা জানতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল, বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্যের হার, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং পাঠদানের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে যেসব কলেজে শূন্য পাশ কিংবা ১০ শতাংশের নিচে পাশের হার রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদান কার্যক্রম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কারণ, একটি বোর্ডের ফলাফল শুধু পাশ-ফেলের সংখ্যা নয়; এটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের শিক্ষার মান ও শিক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ সূচক। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের এবারের ফলাফল সেই সক্ষমতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

দিনাজপুর মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. বোরহান উদ্দিন জানান, এবার কিছুটা ফলাফল অন্যান্য বিগত বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা খারাপ হয়েছে। তবে কী কারণে খারাপ হয়েছে সেটি খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।

এসএস