তবে এই আশাবাদের আড়ালেই সামনে এসেছে নতুন উদ্বেগ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের অধিকাংশ বাঘের শরীরে বাসা বেঁধেছে একাধিক পরজীবী। একই সঙ্গে শনাক্ত হয়েছে এমন কয়েক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যেগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত অনেক অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। অন্যদিকে ছয় মাস চিকিৎসার পর বনে অবমুক্ত করা একটি বাঘিনীর ১৬ দিনেও কোনো সন্ধান না মেলায় সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থাৎ, শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়লেই সংরক্ষণের সাফল্য নিশ্চিত হয় না; তাদের সুস্বাস্থ্য, নিরাপদ আবাস ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীতে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘বাঘ শুধু বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী নয়, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা অনন্য। তাই বাঘ সংরক্ষণ মানেই পুরো সুন্দরবনকে রক্ষা করা।’
তিনি জানান, মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমাতে সরকার ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিশন গঠন করেছে। পাশাপাশি বাঘ ও বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তথ্যদাতাদের জন্য ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সুন্দরবনে বন্যপ্রাণীর জন্য সুপেয় পানির উৎস বাড়াতে ৮০টি পুকুর খনন এবং নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ২০টি উঁচু ঢিবি নির্মাণ করা হয়েছে। লোকালয়ে বাঘের প্রবেশ ঠেকাতে বনসংলগ্ন এলাকায় ৭৪ কিলোমিটার নাইলনের বেড়াও দেয়া হয়েছে।
বাড়ছে বাঘ, কী বলছে জরিপ
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ৬০৫টি গ্রিডে ১ হাজার ২১০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসিয়ে ৩১৮ দিন ধরে তথ্য সংগ্রহ করে বন বিভাগ। ১০ লাখের বেশি ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে শনাক্ত হয় ১৯টি শাবক।
এর আগে, ২০১৫ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬ এবং ২০১৮ সালে ১১৪। সর্বশেষ জরিপে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে গড়ে ২ দশমিক ৬৪টি বাঘের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বাঘের বিচরণ সবচেয়ে বেশি শরণখোলা, চাঁদপাই, সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটক ও বনকর্মীদের চোখে আগের তুলনায় বেশি বাঘ ধরা পড়ছে, যা বনে খাদ্যের প্রাপ্যতা ও নিরাপদ পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়।
নতুন উদ্বেগ: বাঘের শরীরে পরজীবী ও অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু
বাঘ সংরক্ষণে সবচেয়ে আলোচিত নতুন তথ্য এসেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথ গবেষণায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা বাঘের ৮৫ শতাংশের বেশি নমুনায় অন্তত ১৫ ধরনের পরজীবীর উপস্থিতি রয়েছে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে স্পিরোমেট্রা ম্যানসোনি নামের ফিতাকৃমি, যা বাঘের মস্তিষ্ক, চোখ ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া টক্সোকারা ক্যাটি নামের গোলকৃমি, ব্যালানটিডিয়াম কোলাই, ইকাইনোককাস গ্রানুলোসাসসহ আরও কয়েকটি পরজীবীর অস্তিত্ব মিলেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, গবেষকরা বাঘের শরীরে ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, ই-কোলাই, এন্টারোকক্কাস ফেকালিস ও স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াসসহ চার ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে অসুস্থ বাঘের চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, নদী-খালে মানুষের বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য এবং পর্যটন ও নৌযানের মাধ্যমে এসব জীবাণু সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
নিখোঁজ সেই বাঘিনী
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মানুষের পাতা ফাঁদে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা একটি বাঘিনীকে ছয় মাস চিকিৎসার পর গত ১৩ জুলাই সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। কিন্তু এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বন বিভাগ ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে বাঘিনীটিকে খুঁজছে। তবে এখন পর্যন্ত তার কোনো ছবি ধরা পড়েনি।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেডিও কলার বা জিপিএস ট্র্যাকার ছাড়া বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। তাদের মতে, এতে বাঘিনীটির অবস্থান, চলাচল ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংরক্ষণে নতুন বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ এখন শুধু চোরাশিকার বা মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঝুঁকিতে নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, রোগজীবাণুর বিস্তার, জিনগত বৈচিত্র্যের সংকট এবং আধুনিক রোগব্যাধিও নতুন করে হুমকি হয়ে উঠছে।
তাদের সুপারিশ, বনসংলগ্ন এলাকায় কুকুরের টিকাদান নিশ্চিত করা, পর্যটন ও বনজীবীদের স্বাস্থ্যবিধি কঠোর করা, বন্যপ্রাণীর রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশেষায়িত গবেষণাগার গড়ে তোলা এবং উদ্ধার করা প্রাণী অবমুক্ত করার আগে আন্তর্জাতিক মানের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনের নদী-খাল পেরিয়ে বাঘের চলাচল তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, নিজের এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই তারা নিয়মিত সাঁতার কাটে। তবে এতো কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।’
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কারণে বাঘ-মানুষের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সম্প্রতি সুন্দরবনে বাঘের চলাচলও আগের তুলনায় বেড়েছে। আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপন করা ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনের বাঘকে নিরাপদ রাখাই আমাদের লক্ষ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। ফলে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে অবাধে বিচরণ করছে এবং বন অপরাধও কমেছে।’
পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, ‘সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন বাঁচলে উপকূলও নিরাপদ থাকবে।’
বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ বলেন, ‘শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে হরিণ রক্ষা করতে হবে। হরিণই বাঘের প্রধান খাদ্য। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাঘের আবাসস্থল রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঘকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুন্দরবনের পুরো বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের পরিবেশগত নিরাপত্তা। তাই বাঘ সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে চোরাশিকার ও বন্যপ্রাণী পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বনের আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ন রাখা, রোগবালাই পর্যবেক্ষণে আধুনিক গবেষণা জোরদার করা এবং বননির্ভর মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ হবে।





