‘কিংবদন্তি’ কারা, মানদণ্ড কী?

প্রতীকী ছবি (এআই জেনারেটেড)
ফিচার
0

সৃষ্টির শুরু থেকে এ পর্যন্ত যুগে যুগে কোটি কোটি মানুষ এই পৃথিবীতে এসেছেন। সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে তারা একসময় হারিয়েও গেছেন মহাকালের গর্ভে। তবে এই চেনা স্রোতের বিপরীতে হেঁটেছেন কিছু মানুষ। তারা নিজেদের অসাধারণ কর্ম, অনবদ্য অবদান আর অনন্য মেধা দিয়ে সময়ের ক্ষরস্রোতকেও জয় করেছেন। হারিয়ে যাননি, বরং বেঁচে আছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মে, মানুষের মনে। স্থান করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়, হয়ে উঠেছেন অনুকরণীয়। এই মানুষগুলোকেই আমরা একনামে চিনি ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে।

তবে তত্ত্বের খাতিরে ‘কিংবদন্তি’ আসলে কী, কারা এই তালিকায় পড়েন আর কারা পড়েন না, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের যেন শেষ নেই।

শাব্দিক বা সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কিংবদন্তি হলো ইতিহাস ও কল্পনার সংমিশ্রণে গঠিত এমন এক ধরনের লৌকিক আখ্যান বা জনশ্রুতি, যা যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত থাকে এবং সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। ইংরেজি ‘লিজেন্ড’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত এই শব্দ দিয়ে মূলত এমন কিছু বীরত্বগাথা, অতিপ্রাকৃত বা ঐতিহাসিক ঘটনাকে বোঝানো হয়; যা শতভাগ ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত না হলেও, মানুষ সত্য বলে বিশ্বাস করে। এটি একটি জাতির পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাহক, যা প্রাচীন ইতিহাসকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে নতুন প্রজন্মের কাছে বীরত্ব, সাহস ও নৈতিকতার বার্তা পৌঁছায়।

প্রতীকী ছবি |ছবি: সংগৃহীত

তবে আধুনিক যুগে ‘কিংবদন্তি’ শব্দটির পরিধি কেবল লোকগাথায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন ব্যক্তিমানুষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কেমব্রিজ ডিকশনারির সংজ্ঞানুযায়ী লিজেন্ড হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিখ্যাত এবং যার কাজ মানুষের কাছে ভীষণভাবে প্রশংসিত। ভোকাবুলারি ডট কমের মতে, লিজেন্ড বলতে এমন এক জননন্দিত ব্যক্তিত্বকে বোঝায়, যিনি তার অসাধারণ কর্মদক্ষতা এবং সমাজ-সংস্কৃতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের জন্য মানুষের মুখে মুখে আলোচিত হন।

বলা চলে, যারা নিজেদের অনন্য কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন, তারাই কিংবদন্তি। উদাহরণ হিসেবে সংগীত জগতের কথা ধরা যাক। মাইকেল জ্যাকসন একসময় তার অভিনব ও সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের স্টেজ পারফরম্যান্স দিয়ে বিশ্বজুড়ে যে উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আজ তিনি বেঁচে না থাকলেও তার গানের সুর, সিগনেচার স্টাইল ও নাচের স্টেপগুলো (যেমন মুনওয়াক) এখনও সমসাময়িক তরুণদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় ও প্রাণবন্ত।

খেলাধুলার ইতিহাসের পাতা উল্টালো কিছু নাম স্বমহিমায় জ্বলজ্বল করে। ফুটবলের রাজপুত্র পেলে, ডিয়েগো ম্যারাডোনা, গারিঞ্চা, জিনেদিন জিদান কিংবা জোহান ক্রুইফ; তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ফুটবল শৈলী দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে অমর হয়ে আছেন। তাদের খেলার ধরন ও কৌশল আজও আধুনিক ফুটবলারদের কাছে পাঠ্যবইয়ের মতো অনুকরণীয়।

পেলে ও ম্যারাডোনা |ছবি: সংগৃহীত

আবার বর্তমান সময়ে মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এমন তারকাদের মধ্যে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ফুটবলকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা এককথায় অনন্য। সমসাময়িক বিশ্ব ফুটবলে এই দুই ধ্রুবতারাকে অনুকরণ করা তরুণদের সংখ্যা কোটি কোটি। আর এই কারণেই ফুটবল বিশ্লেষকদের চোখে তারা দুজনই ‘জীবন্ত কিংবদন্তির’ তকমা পেয়েছেন।

রোনালদো ও মেসি |ছবি: সংগৃহীত

বক্সিং রিংয়ের কথা উঠলে সবার আগে আসে মোহাম্মদ আলীর নাম। কঙ্গোতে জর্জ ফোরম্যানের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত তার সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটি ইতিহাসের পাতায় ‘রাম্বল ইন দ্য জঙ্গল’ নামে অমর হয়ে আছে। রিংয়ের ভেতর তার চোখের পলকে করা মুভমেন্ট এবং আক্রমণাত্মক খেলার ধরনকে বলা হতো ‘প্রজাপতির মতো ওড়ো, মৌমাছির মতো হুল ফোটাও’।

মোহাম্মদ আলীর বক্সিং ম্যাচের ছবি |ছবি: সংগৃহীত

তবে আলী কেবল রিংয়ের ভেতরই কিংবদন্তি ছিলেন না, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবদানও ছিল অনবদ্য। আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার আপসহীন অবস্থানের কারণে তিনি বিশ্বমানবতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছেন।

শুধু বিনোদন কিংবা খেলাধুলা নয়; গবেষণা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, অর্থনীতি ও রাজনীতির মতো গম্ভীর ক্ষেত্রগুলোতেও এমন বহু কিংবদন্তি এসেছেন, যাদের অবদান মানব সভ্যতার গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।

দার্শনিক প্লেটোর চিন্তাধারা যেমন আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, তেমনি বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন ও আলবার্ট আইনস্টাইনের পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলো মহাবিশ্বকে দেখার চোখ বদলে দিয়েছে। আবার আব্রাহাম লিংকনের মতো দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতারা বদলে দিয়েছেন বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র।

আইজ্যাক নিউটন; অ্যালবার্ট আইনস্টাইন; প্লেটো |ছবি: এখন টিভি

কিংবদন্তিরা আসলে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ফ্রেমে বন্দী থাকেন না। তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে সময়কে জয় করেন। এক প্রজন্ম পেরিয়ে অন্য প্রজন্মে, এক যুগ পেরিয়ে অন্য যুগে তারা স্থানান্তরিত হন একটি ‘অনুকরণীয় সত্ত্বা’ হিসেবে। মহাকালের নিয়মে তাদের শরীরী অবসান ঘটলেও; কর্মের আলোয় তারা থেকে যান অবিনশ্বর।

এসএইচ