বরগুনায় বাড়ছে হামের প্রকোপ; ‘হটস্পট’ ঘোষণার পরও কমছে না সংকট

হাসপাতালে হাম ওয়ার্ডে রোগী ও স্বজনরা
এখন জনপদে
স্বাস্থ্য
0

উপকূলীয় জেলা বরগুনায় গত বছরের ডেঙ্গু মহামারির ক্ষত এখনো শুকায়নি। ১৫ জনের প্রাণহানি আর হাজারো মানুষের ভোগান্তির রেশ কাটতে না কাটতেই জেলাটিতে এবার জেঁকে বসেছে হামের প্রাদুর্ভাব। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরগুনা সদর উপজেলাকে হামের ‘হটস্পট’ ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সংকট সাধারণ হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি গভীর।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জেলায় এ পর্যন্ত ২৭০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৩৮ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৩ জন। তবে স্থানীয় পর্যায়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সন্দেহের তালিকায় থাকা ৩ শিশুর মৃত্যুর খবর। আক্রান্তদের মধ্যে জ্বর, সর্দি, তীব্র কাশি এবং শরীরে লালচে র‍্যাশের লক্ষণ নিয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাধারণত নির্দিষ্ট বয়সের পর শিশুরা আক্রান্ত হলেও এবার ৩ থেকে ৪ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলছে।

জনস্বাস্থ্য গবেষক ও আইইডিসিআর কর্মকর্তা ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন বলেন, ‘টিকাদানের হার একসময় ৯০ শতাংশের ওপরে থাকলেও বর্তমানে দ্বিতীয় ডোজ থেকে অনেক শিশু বাদ পড়ছে, যা এ প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। অনেক অভিভাবক ৯ মাসে প্রথম ডোজ দিলেও ১৫ মাসের দ্বিতীয় ডোজটি দিচ্ছেন না। এছাড়া মাতৃপুষ্টির অভাব শিশুদের দুর্বল অ্যান্টিবডির কারণ হতে পারে। বরগুনার এই বিশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের গভীর গবেষণা প্রয়োজন।’

আরও পড়ুন:

বরগুনার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী সীমাবদ্ধতাগুলো এ সংকটে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জেলায় কোনো পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি নেই। ফলে সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাতে হয়। সেখান থেকে রিপোর্ট আসতে আসতে অনেক মূল্যবান সময় পার হয়ে যায়, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।

বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, ‘বর্তমানে এ হাসপাতালে খাবার স্যালাইন বা ওষুধের কোনো সংকট নেই। তবে নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও আমরা সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছি রোগীদের সেবা দিতে। যার ফলে হামের সংক্রমণ কিছুটা কমছে।’

এদিকে বরগুনা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা সংক্রমণ রোধে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে সদর উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে।’

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর অন্তর হামের বিশেষ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল চিকিৎসা দিয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। উপকূলীয় এই জনপদে দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা এবং কুসংস্কার সংক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আইইডিসিআরের গবেষকরা মনে করছেন, সঠিক ও গভীর জনস্বাস্থ্য গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে।

এফএস