মানসিক চাপে বিপন্ন সমাজ; চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত ৯১ শতাংশ

হাতাশাগ্রস্ত আবু নাঈম, কিশোররা গানের আড্ডায় মেতেছেন, নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাতে ঘরি দেখছেন এক নারী
বিশেষ প্রতিবেদন
স্বাস্থ্য
1

যুদ্ধ, মহামারি, সংঘাত-অস্থিরতায় প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের আচরণ। হুটহাট রেগে যাওয়া, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপে বিপন্ন সমাজ ব্যবস্থা। নেই মানসিক চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ। দেশে এই সেবা থেকে বঞ্চিত ৯১ শতাংশ মানুষ। প্রতি পাঁচ লাখ মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র এক জন সাইকিয়াট্রিস্ট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রান্তিক দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দরকার কার্যকর উদ্যোগ।

রিকশাওয়ালা সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তর্ক, বাসের কন্ডাক্টরের সঙ্গে খুচরো নিয়ে ঝামেলা, কথা কাটাকাটি। একটুতেই মেজাজ হচ্ছে চড়া।

আবু নাঈম, বেসরকারি চাকরিজীবী। মাথায় কেবলই চিন্তা সেলসের টার্গেট পূরণ হবে তো? অকপটে বললেন, শুধু দিন না, রাতের ঘুমটাও বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।

আবু নাঈম বলেন, ‘নিজেদের বিসর্জন দিয়েই তারপরে চাকরিতে করতে হয়, ঠিক আছে? রাতের ঘুম বলেন, শখের জিনিস বলেন, বন্ধুবান্ধব আড্ডা বলেন—সবকিছু থেকেই বিরত রাখতে হয়।’

জরিপ বলছে, দেশের প্রতি ১০০ জনে প্রায় ১৯ জন বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের মতো সমস্যায় ভুগছেন। ছোট ছোট ঘটনা হঠাৎ রূপ নিচ্ছে বড় কোনো ঘটনায়। মূল্যস্ফীতির চাপে আয়-বায়ে বেশামাল মানুষের বাজারে গেলেই যেন উবে যায় মেজাজ।

বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘বাজারে আসলে আসলে মেজাজ ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই ধরনের প্রাইস যখন ওরা বলে, কোনো সবজি পাবেন না ১০০ টাকা, ৮০ টাকার নিচে।’

শুধু প্রাপ্তবয়স্ক কেন, কেমন আছে এই শহরের শিশুরা? স্কুলের ব্যাগের ওজন যেন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। খেলার মাঠ নেই, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো বিকেল নেই, একসঙ্গে গান গাওয়া শৈশব যেন কোথায় হারিয়ে ফেলা।

আরও পড়ুন:

অবশ্য যতটুকু সময় শিশুদের জন্য ডিভাইসে, বলছেন পড়াশোনার চাপে বিনোদনের বরাদ্দ খুবই কম। অভিভাবকরাও দেখছেন আচরণগত নানা পরিবর্তন। প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে ২৪ জন শিশু ভুগছেন মানসিক স্বাস্থ্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায়।

অভিভাবকদের মধ্যে একজন বলেন, ‘ওরা হঠাৎ করে সবার সাথে মিশতে পারে না। ওরা খুব হেজিটেন্ট ফিল করে। দেখা যায় যে ওরা নিজেদের মধ্যে থাকতে পছন্দ করে, ডিভাইস নিয়ে থাকতে পছন্দ করে।’

শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘করোনার পর থেকে মানুষের মস্তিষ্ককে ফোন এমনভাবে অ্যাট্রাক্ট করছে যে, এটা মানুষ না চাইলেও না চাইলেও ধরে। মানুষের চাওয়ার দরকার নেই, এটা একটা ডোপামিনের দোষ। মানুষের ডোপামিন সিস হওয়ার কারণে এসব হয়।’

সমাজবিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সমাজব্যবস্থার বিপরীতে বাণিজ্যিক ও সামাজিক জীবনযাপন প্রতিফলিত হচ্ছে মানুষের আচরণে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমাদের যে যাপিত জীবন ব্যবস্থা সূত্র ধরে অগ্রহণযোগ্য কিংবা আমাদের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক যে পরিমাপ আছে, আমাদের যে নির্দেশনা আছে, এর বিপরীত বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে আমরা যে যাচ্ছি, আমাদের সামাজিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ার পরিবর্তে আমাদের মধ্যে একটা অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করছে, আমাদেরকে নানা ধরনের অপরাধ কিংবা সমাজবিরুদ্ধ আচরণের দিকে ধাবিত করছে।’

আরও পড়ুন:

এদিকে সবশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, প্রয়োজনীয় সেবা পান না প্রায় ৯১ শতাংশ মানুষ—অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে ৯ জন। মানে ডাক্তাররা বলছেন, শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক নয়, প্রান্তিক পর্যায়েও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘প্রান্তিক মানুষরাও যাতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ভিতরে আসতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য দরকার আসলে গবেষণা লব্ধ তথ্যের ব্যবহার। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সঠিক নীতি এবং তার বাস্তবায়ন এবং অতি অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বাজেটের বরাদ্দ বৃদ্ধি।’

সারা দেশে সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন মাত্র ৩৮০ জনের মতো। ঘরে প্রতি পাঁচ লাখ মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একজন মানসিক রোগের চিকিৎসক।

ঝড়, বৃষ্টি কিংবা বৈরী আবহাওয়া, এভাবেই আমাদের ছুটে চলতে হয়। একদিকে ছুটে চলা আর অন্যদিকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। মাঝখানে এই সময়টুকুই আমাদের যাপিত জীবন। এই জীবনকে আমরা কতটুকু উপভোগ করতে পারছি? কতটুকুই বা মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে পারছি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁচার মতো বেঁচে থাকতে হলে প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া।

এসএস