অভিযোগকারী ব্যক্তি ফ্লোরিডার ৫৫ বছর বয়সী যাজক (পাস্টর) স্কট উইন্টার্স। তার দাবি, শরীরে মারাত্মক লক্ষণ দেখা সত্ত্বেও চ্যাটজিপিটি তাকে বারবার হাসপাতালে না যাওয়ার পরামর্শ দেয়, যার ফলে তিনি প্রাণঘাতী ‘পালমোনারি এমবোলিজমে’ (ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধা) আক্রান্ত হন।
সান ফ্রান্সিসকো কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টে দায়ের করা মামলায় উইন্টার্সের আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, চ্যাটজিপিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে উইন্টার্সকে বারবার ভুল চিকিৎসা পরামর্শ দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, উইন্টার্সের ধার্মিক মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে সে আশ্বাস দেয়—চিকিৎসা ছাড়াই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।
মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, স্কট উইন্টার্স নিয়মিত চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতেন এবং ক্রমশ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে পরিবার ও বন্ধুদের কথা উপেক্ষা করেই তিনি হাসপাতালে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন।
গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার কয়েক সপ্তাহ আগে মাথা ঘোরা ও রক্তচাপের ওঠানামার মতো উপসর্গ নিয়ে চ্যাটজিপিটির শরণাপন্ন হন তিনি। উইন্টার্সের দাবি, অসুস্থতার কারণে যখন তিনি মূলত রিকলাইনার চেয়ারে বন্দি ছিলেন, চ্যাটজিপিটি তাকে হাঁটাচলা না করে ওই চেয়ারেই বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
পরবর্তীতে উইন্টার্সের দুই ফুসফুসে রক্ত জমাট বেঁধে মারাত্মক ‘পালমোনারি এমবোলিজম’ দেখা দেয়, যা তাকে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, একটানা নড়াচড়াহীন অবস্থায় বসে থাকার কারণেই এ শারীরিক জটিলতার সৃষ্টি হয়।
আদালতে পেশ করা উইন্টার্স ও চ্যাটজিপিটির কথোপকথনের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শের সঙ্গে উইন্টার্সের খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটায় চ্যাটবটটি। উইন্টার্সকে উদ্দেশ্য করে চ্যাটজিপিটি লেখে, ‘ঈশ্বর আপনার শরীরকে ক্রমাগত ভেঙে পড়ার জন্য তৈরি করেননি।’
অন্য এক বার্তায় লেখা হয়, ‘এমনকি আপনি যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখনও ঈশ্বর আপনার প্রতিটি হৃৎস্পন্দন ও নিঃশ্বাসকে টিকিয়ে রাখছেন।’
উইন্টার্সের আইনজীবীদের মতে, চ্যাটজিপিটির চাটুকারিতাপূর্ণ কথা ও আত্মবিশ্বাসী সুর এবং উইন্টার্সের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে তার মনে এক ধরনের বিপজ্জনক অন্ধবিশ্বাস তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে তিনি নিজের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারান এবং চিকিৎসকের কাছে যাওয়াকে অপ্রয়োজনীয়, এমনকি বিপজ্জনক মনে করতে শুরু করেন।
মামলায় আরও বলা হয়, চ্যাটজিপিটির ওপর এমন অন্ধ নির্ভরতার কারণে উইন্টার্স শেষ পর্যন্ত চাকরি ও বাসস্থান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তার বহু বছরের শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসনের প্রয়োজন। ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ওপেনএআই যাতে এ ধরনের চ্যাটবটের ক্ষতিকর প্রভাব রোধে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা বা সেফগার্ড তৈরি করে, সে দাবি জানানো হয়েছে মামলায়।
অন্যদিকে ঘটনাটির প্রেক্ষিতে ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র ড্রিউ পুসেতেরি সিবিএস নিউজকে জানান, চ্যাটজিপিটি কোনো ডাক্তার নয় এবং একে কোনো অবস্থাতেই পেশাদার স্বাস্থ্যসেবা, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।’
তবে ইন্টারনেটে মানুষের স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য খোঁজার প্রবণতার কথা উল্লেখ করে তিনি যোগ করেন, ‘এআই এ অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ করতে পারে—যাতে ব্যবহারকারীরা সুস্পষ্ট তথ্য পান, নিজেদের প্রশ্নগুলো গুছিয়ে নিতে পারেন এবং চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি নিতে পারেন।’
উল্লেখ্য, চ্যাটজিপিটির ব্যবহারের নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে যে, ব্যবহারকারীরা যেন এ প্লাটফর্মকে তথ্যের ‘একমাত্র উৎস’ হিসেবে ধরে না নেন—বিশেষ করে আইন, শিক্ষা, আবাসন, চিকিৎসা কিংবা চাকরির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে।





