সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা অনেকের কাছে নিছক মজার ট্রেন্ড হলেও এর আড়ালে রয়েছে বিভ্রান্তি, মানহানি ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার ঝুঁকি।
নিজের মুখ বসিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার বা প্রিজন ভ্যানে ওঠার দৃশ্য তৈরি করছেন অনেকে। বন্ধুদের সঙ্গে মজা, সামাজিক ঘটনা নিয়ে রসিকতা কিংবা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ—বিভিন্ন কারণেই এসব ছবি তৈরি হচ্ছে। থার্ড-পার্টি ফেস-সোয়াপ অ্যাপ বা গেম ব্যবহার করেও সহজেই এমন ছবি তৈরি করা যাচ্ছে।
মজা থেকে বিভ্রান্তি
সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন নিজের তৈরি করা কৃত্রিম ছবিটি অন্য কেউ নতুন ক্যাপশন দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। মূল পোস্টে হয়তো লেখা ছিল ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি। কিন্তু পরে সেই তথ্য বাদ দিয়ে একই ছবি এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যেন সত্যিই ওই ব্যক্তি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
অর্থাৎ, ছবি একই থাকছে; বদলে যাচ্ছে ছবির সঙ্গে জুড়ে দেয়া গল্প।
বিশেষ করে কোনো সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিল্পী বা রাজনৈতিক ব্যক্তির ছবি এভাবে ছড়িয়ে পড়লে তার সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোনো ছবি একবার ভাইরাল হয়ে গেলে পরে সেটি কৃত্রিম বা ভুয়া বলে জানানো হলেও তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি পুরোপুরি দূর করা কঠিন।
এআইয়ের যুগে ছবি দেখেই বিশ্বাস নয়
আগে ছবি সম্পাদনার জন্য বিশেষ দক্ষতা ও সফটওয়্যারের প্রয়োজন হতো। এখন এআইয়ের সাহায্যে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েই বাস্তবের মতো ছবি তৈরি করা সম্ভব। ফেস-সোয়াপ প্রযুক্তির কারণে কৃত্রিম ছবিতে নিজের বা অন্য কারও মুখ বসিয়ে দেয়া আরও সহজ হয়েছে।
ফলে কোনো ছবি বাস্তবের মতো দেখালেই সেটি বাস্তব, এমন ধারণা এখন আর নিরাপদ নয়।
ছবিতে হাত, আঙুল, পোশাকের লেখা, পুলিশের ব্যাজ, আলো-ছায়া কিংবা অন্যান্য সূক্ষ্ম অসঙ্গতি থাকলে তা কৃত্রিম হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে আধুনিক এআইয়ের ছবি অনেক নিখুঁত হওয়ায় শুধু চোখের দেখায় সিদ্ধান্ত না নিয়ে ছবিটির উৎস যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
ব্যক্তিগত ছবির নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ
এ ধরনের ট্রেন্ডে অংশ নিতে গিয়ে অনেকেই অচেনা থার্ড-পার্টি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে নিজের পরিষ্কার ছবি আপলোড করছেন। কিন্তু সেই ছবি কোথায় সংরক্ষণ হচ্ছে, কে ব্যবহার করতে পারছে কিংবা সেবাটির গোপনীয়তা নীতি কী—এসব বিষয় না জেনেই ছবি দেয়া হচ্ছে।
চেহারা একজন মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ। তাই শুধু মজার ছবি তৈরির জন্য অচেনা অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে ছবি আপলোড করার আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।
অন্যের ছবি ব্যবহার আরও ঝুঁকিপূর্ণ
নিজের ছবি দিয়ে মজার এআই ছবি তৈরি করা আর অন্যের অনুমতি ছাড়া তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়।
কারও মুখ বসিয়ে হাতকড়া পরা, পুলিশি হেফাজতে থাকা কিংবা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার দৃশ্য তৈরি করে ছড়িয়ে দিলে সেটি হয়রানি, বিভ্রান্তি বা মানহানির কারণ হতে পারে। ব্যক্তিগত বিরোধ, সামাজিক শত্রুতা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও এমন ছবি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
একই প্রযুক্তিতে ভিডিও তৈরি করাও সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতে শুধু ভুয়া ছবি নয়, আরও বিশ্বাসযোগ্য কৃত্রিম ভিডিও ব্যবহার করেও বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
কী করবেন?
ফেসবুকে পরিচিত কাউকে হাতকড়া পরা বা পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস বা শেয়ার না করে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি।
ছবিটির সঙ্গে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র আছে কি না দেখুন। কোনো সংবাদমাধ্যমের খবরের দাবি করা হলে তাদের মূল ওয়েবসাইটে খবরটি খুঁজে দেখুন। অন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে একই ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে কি না যাচাই করুন। ছবিটি পুরোনো কি না, সেটিও দেখুন। ছবির উৎস অস্পষ্ট হলে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। অচেনা অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে নিজের ছবি দেওয়ার আগে তাদের গোপনীয়তা নীতি যাচাই করুন।
এআইয়ের যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; চোখের সামনে দেখা ছবিও কৃত্রিম হতে পারে, আর সেই ছবির সঙ্গে বলা গল্পও হতে পারে সম্পূর্ণ বানানো।





