নিজের ‘পাতা ফাঁদেই’ হারলেন মমতা!

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী
বিদেশে এখন
0

পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে বড় জয় পেয়েছে বিজেপি। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। অন্যদিকে, গত নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হওয়া তৃণমূল এবার মাত্র ৮১টি আসনে থিতু হয়েছে। ৪ মে ফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা হলো। এনডিটিভির মতামত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পরাজয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তৃণমূলের নির্বাচনি প্রচারের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ ও ‘স্বাস্থ্যসাথীর’ মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি। বিপরীতে বিজেপি এসব প্রকল্পের সুবিধা আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। এর ফলে অনেক সাধারণ ভোটার মনে করেছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও তাদের এসব আর্থিক সুবিধা বন্ধ হবে না।

তৃণমূলের পতনের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে নারী নিরাপত্তা ও আরজি কর হাসপাতালের তরুণ চিকিৎসকের হত্যাকাণ্ডকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মা, মাটি, মানুষ’ স্লোগান এবং নারী ক্ষমতায়নের রাজনীতির ওপর এই ঘটনা বড় আঘাত হেনেছে। কলকাতার আরজি করের ঘটনাকে দিল্লির নির্ভয়াকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।

রাজ্যে শিল্পের অভাব এবং ‘সিন্ডিকেট’ সংস্কৃতির আধিপত্যও তরুণ ভোটারদের তৃণমূলবিমুখ করেছে। কর্মসংস্থানের অভাবে পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার যুবক অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সিন্ডিকেটগুলো নির্মাণ ও সরবরাহ খাত থেকে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। বিজেপির ‘পরিবর্তন’ স্লোগান এবং এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ার প্রতিশ্রুতি অনেককে আকৃষ্ট করেছে।

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতিও এবার কাজ করেছে জোরালোভাবে। বিজেপির হিন্দু-মুসলিম আখ্যানের বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। একদিকে ইমামদের ভাতা দেয়া বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হিজাব পরে তার উপস্থিতি, অন্যদিকে মন্দিরে মন্দিরে গিয়ে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হিন্দু ভোটারদের বড় একটি অংশকে ক্ষুব্ধ করেছে।

বিজেপির এই জয়ের পেছনে ভারতের নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার বড় ভূমিকা ছিল। ভোটগ্রহণের আগে তারা কলকাতাকে একরকম নিজেদের দ্বিতীয় বাড়ি বানিয়ে ফেলেছিলেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক রদবদল তৃণমূলের মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেয়। প্রায় আড়াই লাখ আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন এবং ভিনরাজ্যের কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচনি কাজ পরিচালনা করার ফলে তৃণমূলের জন্য ভোট প্রভাবিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই ফল তৃণমূলের ভেতরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব ও উত্তরসূরি হওয়ার পথকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দলটির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো এখন অস্তিত্ব সংকটে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাধারণত দেখা যায়, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা বিজয়ীর শিবিরে ভিড় করে। ফলে তৃণমূলের জন্য আগামী দিনগুলোতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ালো।

এএম