গান গেয়ে নেপালের জনগণের মন জয় করে রাজনীতির মাঠেও বাজিমাত করেন র্যাপার বালেন্দ্র শাহ। মেয়র হওয়ার পর দেশটির ৪৭তম এবং সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হয়ে গড়েছেন ইতিহাসও। জেন-জি বিক্ষোভ ও গণ-অভ্যুত্থানে কে পি শর্মা ওলি প্রশাসন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ৫ মাসের মাথায় গত মার্চে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেই নেপালের রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন বালেন্দ্র শাহ।
প্রথাগত রাজনৈতিক কৌশল এড়িয়ে, দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার নীতিতে এগোচ্ছে তরুণ প্রজন্মের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠা এই নেতা। এরইমধ্যে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করাসহ বহু একক ও অপ্রতিরোধ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির এই নেতা। এসব কারণে অস্বস্তিতে দল ও জেন-জি সরকারের অন্যান্য সদস্যরা। এছাড়া দায়িত্ব নেয়ার ৬০ দিন পেরিয়ে গেলেও পার্লামেন্টে একদিনও কথা না বলায় সমালোচনার মুখে পড়েন এই র্যাপার প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুন:
হানিমুন পিরিয়ডের প্রায় তিন মাসের মাথায় গত রোববার পার্লামেন্টে প্রথম বক্তব্য দিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেন বালেন্দ্র শাহ। ভারত-চীনের সঙ্গে থাকা বিতর্কিত সীমান্ত লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা এবং কালাপানি সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর— তিনি জানতে পেরেছেন যে, শুধু ভারতই নয়; নেপালও অনেক জায়গায় ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করেছে। এটি বলতেই সংসদে তুমুল হট্টগোল তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যটি বাতিলের দাবিও তোলেন বিরোধী সংসদ সদস্যরা।
ভারত-চীনের সঙ্গে থাকা সীমান্ত সমস্যা ইস্যুতে ব্রিটেনকে ভিলেন বানাতেও ছাড়েননি নেপালের তরুণ প্রধানমন্ত্রী। দায়ী করেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কৈরি মানচিত্রকে। তাই সমস্যা সমাধানে দিল্লি ও বেইজিংয়ের পাশাপাশি এবার লন্ডনের সঙ্গেও কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানান বালেন্দ্র শাহ। এরইমধ্যে দিল্লি ও বেইজিংকে চিঠি দিয়েছে কাঠমান্ডু। এমনকি ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত রব ফেনের কাছে সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন বালেন্দ্র শাহর প্রধান উপদেষ্টা কুমার ব্যঞ্জনকার।
বিতর্কিত ৩টি সীমান্তের মধ্যে একমাত্র লিপুলেখের অবস্থান ভারত, চীন ও নেপালের সংযোগস্থলে। আর ব্রিটিশ আমলে ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত কুখ্যাত সেলুলার জেলটি কালাপানি নামে পরিচিত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির পর কালাপানি অঞ্চলের সীমান্ত বিরোধ শুরু হয়।
নেপালি সীমান্ত বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, ২১০ বছরের পুরনো চুক্তি এবং সবশেষ ১৮৭৯ সালে করা ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া সার্ভের ঐতিহাসিক মানচিত্রের ভিত্তিতে লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানি নিয়ে গঠিত ৩৭২ বর্গ কিলোমিটারের এলাকা নেপালের। আর ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর থেকে লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা এবং কালাপানি অঞ্চলটি—মহাকালী নদীর পূর্ব দিকে ৩৭২ বর্গকিলোমিটার ভারতের দখলে।
এখন প্রশ্ন হলো; নিজের একক সিদ্ধান্তে সীমান্ত ইস্যুতে কূটনৈতিক জট আদৌ কী খুলতে পারবেন বালেন্দ্র শাহ? কারণ সম পদমর্যাদা ছাড়া অন্য কারোর সাথে কূটনৈতিক আলোচনা করতে চান না বলে গত মাসে ঘোষণা দেন তিনি। যার কারণে ওই সময় কাঠমান্ডু সফর বাতিল করতে বাধ্য হন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি। এতে করে দু'দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের শঙ্কা প্রকট হয়।
এদিকে নেপালে তিব্বতি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধা পাক, তা চায় না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে চীন। জেন-জি আন্দোলনকালে অনেক বিক্ষোভকারীকে 'টিওবি' লেখা টি-শার্ট পরে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়। এই গোষ্ঠীটি তিব্বত মুক্ত করতে সক্রিয় ভিক্ষুদের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হয়। সার্বিক পরিস্থিতিতে নেপালের র্যাপার প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক সফলতা ধরা দেয় কিনা- তাই এখন দেখার বিষয়।





