খামেনির জানাজায় কোরআনের আয়াত নির্বাচনে কূটনৈতিক বার্তার ইঙ্গিত

গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছেন শোকাহত মানুষ
বিদেশে এখন
1

তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের জন্য কোরআনের ভিন্ন ভিন্ন আয়াত পাঠ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আয়াত নির্বাচনের এই ধরন কূটনৈতিক বার্তা বহন করে থাকতে পারে। মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণী এমন তথ্য উঠে এসেছে।

সৌদি আরবের প্রতিনিধিদল যখন কফিনের সামনে এগিয়ে যায়, তখন সুরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়। এই আয়াতে বদর যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে, যেখানে সংখ্যায় ও অস্ত্রে কম থাকা মুসলিম বাহিনী বৃহৎ এক বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত বদর যুদ্ধের ভূখণ্ড আজকের সৌদি আরবের অন্তর্গত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আয়াত নির্বাচন ইরান ও সৌদি আরবের অভিন্ন ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে, আবার সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেও এর ব্যাখ্যা রয়েছে।

সাম্প্রতিক যুদ্ধে সৌদি আরবের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান পাওয়া যায়নি।

জানাজায় ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। উল্লেখ্য, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে নিজ বাসভবনে ইসরাইলি-মার্কিন হামলায় নিহত হন। এতে তার ১৪ মাস বয়সী নাতনি, জামাতা ও পুত্রবধূও প্রাণ হারান। গত ৩ দিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তার মরদেহ রাখা হয়। আয়াত নির্বাচনের ধরন বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বার্তা লক্ষ করা যায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রতিরোধ অক্ষভুক্ত গোষ্ঠীগুলোর জন্য: হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামি জিহাদ, হিজবুল্লাহ, হুতি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং আফগানিস্তানের তালেবানের প্রতিনিধিদের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলোর মূল বিষয়বস্তু ছিল আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার, শাহাদাত ও বিজয়সংক্রান্ত। হামাসের জন্য পাঠ করা আয়াতে ‘আল্লাহর কাছে দেয়া অঙ্গীকারে সত্যবাদী মানুষদের’ কথা বলা হয়েছে। হিজবুল্লাহর জন্য নির্বাচিত আয়াতে ‘প্রকৃত বিশ্বাসীদের’ প্রসঙ্গ এসেছে। ইয়েমেনের হুতিদের জন্য পাঠ করা হয় সুরা আল-ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াত। ইরাকের হাশদ আল-শাবির জন্য পড়া হয় ‘আল্লাহর পথে শহীদদের’ প্রসঙ্গের আয়াত। ফিলিস্তিনি ইসলামি জিহাদ ও তালেবানকে শোনানো হয় সুরা আল-ফাতহের সূচনা অংশ, যেখানে ‘সুস্পষ্ট বিজয়ের’ কথা বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় মিত্রদের জন্য

রাশিয়া, চীন, ভারত এবং মিসরের দ্বিতীয় তেলাওয়াতে ধার্মিকতা, আশ্বাস ও পুরস্কারসংক্রান্ত আয়াত বেছে নেয়া হয়। রাশিয়ার জন্য নির্বাচিত আয়াতে ‘পরকালের চিরস্থায়ী আবাসের’ কথা বলা হয়েছে। চীনের জন্য পাঠ করা আয়াতটি ছিল ‘আল্লাহ এটি কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদ ও হৃদয়ের প্রশান্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছেন’ শীর্ষক। ভারতকে হিজবুল্লাহর জন্য ব্যবহৃত আয়াতটিরই একটি অংশ শোনানো হয়। মিসরকে বলা হয়, ‘যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ’।

আঞ্চলিক অংশীদারদের জন্য

কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিসরের প্রথম তেলাওয়াত ছিল ভিন্ন ধরনের। মধ্যস্থতাকারী কাতারকে সেই একই ‘সুস্পষ্ট বিজয়ের’ আয়াত পাঠ করে শোনানো হলেও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর অর্থ ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। তুরস্কের জন্য নির্বাচিত আয়াতে ‘ধন-প্রাণ দিয়ে সংগ্রামকারীদের’ প্রসঙ্গ এসেছে। তুরস্ক এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইসরাইল আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে।

পাকিস্তানকে শোনানো হয় ব্যক্তিগত প্রার্থনার আয়াত ‘আমাকে সম্মানজনক প্রবেশ ও প্রস্থানের সুযোগ দিন।’ যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসলামাবাদ ও দোহা কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। মিসরের প্রথম আয়াতে ‘চিরস্থায়ী জান্নাতের’ প্রতিশ্রুতির কথা ছিল।

লেবাননের সরকারের প্রতিনিধিদলের জন্য বেছে নেয়া হয় সুরা আন-নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত ‘যদি আমি তাদের নিজেদের উৎসর্গ করতে বা ঘরবাড়ি ত্যাগ করতে আদেশ করতাম, তবে তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই তা মানতো।’ ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবানন সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়াত নির্বাচনের মাধ্যমে ইরান লেবানন সরকারের প্রতি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে।

এএম