বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ডেলিভারির জন্য চীনে ইরানি তেলের কার্গো অফার জুলাই ও আগস্টের তুলনায় কমেছে। তাদের মতে, সমুদ্রে থাকা জাহাজের তেল বিক্রি হয়ে যাওয়ায় অফার কমছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাহাজ চলাচল ও বন্দরঘিরে অবরোধ আবার কার্যকর করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ থামানোর একটি সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর তেল বিক্রি বন্ধের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে তেল বিক্রির ওপরই তেহরান বেশি নির্ভর করে।
জাহাজ চলাচল ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে ইরানের তেল রপ্তানি কমেছে। ওই সময়ের পর ইরানি অপরিশোধিত তেল বহনকারী সুপারট্যাংকারগুলোর হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার কোনো দৃশ্যমান তথ্য নেই। যদিও অনেক জাহাজ তাদের অবস্থান জানানোর ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে, ফলে ট্র্যাক করা কঠিন হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
সরবরাহ কমায় চীনের শানডং প্রদেশের স্বাধীন শোধনাগারগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে বলে সূত্রগুলো বলছে। এসব শোধনাগার ‘টিপট’ নামে পরিচিত। চীনের মোট শোধন সক্ষমতার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তাদের, এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের বড় ক্রেতা হিসেবেও তারা পরিচিত।
তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত ছাড়ে বিক্রি হওয়া কিছু ইরানি অপরিশোধিত তেল এখন আইসিই ব্রেন্ট ফিউচারসের তুলনায় প্রিমিয়ামে অফার করা হচ্ছিল। এক সূত্রের হিসেবে, প্রিমিয়াম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২ ডলার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি বড় পরিবর্তন, কারণ এ সপ্তাহের শুরুতেই ইরানিয়ান লাইট কার্গো ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৩ ডলার ছাড়ে অফার করা হচ্ছিল, যা এক মাস আগের মতোই ছিল।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ-জোনের বাইরে ভাসমান মজুতে থাকা ইরানি অপরিশোধিত তেল ১০৫ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে কমে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমেছে। দুটি সূত্রের ধারণা, এশীয় জলসীমায় ইরানি অপরিশোধিত তেল আছে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল, যা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় অর্ধেক। কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুইউ স্যু হিসাব করেছেন, সিঙ্গাপুরের পূর্বে মালয়েশিয়ার জলসীমায় জাহাজে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল আছে, তবে তার বেশির ভাগই ক্রেতাদের জন্য আগে থেকেই প্রতিশ্রুত।
শুক্রবার লিংকডইনে দেয়া পোস্টে মুইউ স্যু লিখেছেন, ‘এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকের ডেলিভারি থেকে নতুন ইরানি সরবরাহ প্রায় থাকছে না, কারণ এখন পর্যন্ত ইরানি তেলবোঝাই ট্যাংকার যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ভেঙে এগোতে পারেনি।’
সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ায় এক টিপট এ সপ্তাহে ব্রাজিলের লাপা অপরিশোধিত তেল কিনেছে, আর অন্যরা ইরাকের বসরা অপরিশোধিত তেল বিবেচনা করছে বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে। ‘এনার্জি অ্যাসপেক্টস’-এর জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক সান জিয়ানান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে ইরানি তেলের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় চীনের টিপটগুলো এখন রাশিয়া ও ইরানের বাইরে তাকাচ্ছে।’
কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি কমার প্রেক্ষাপটে চীনের ইরানি তেল আমদানি এক বছর আগের তুলনায় কমেছে। জুনে তা নেমে আসে দৈনিক ৭ লাখ ৮৫ হাজার ব্যারেলে, যা ফেব্রুয়ারি ২০২৩-এর পর সর্বনিম্ন। জুলাইয়ে তা দৈনিক ৮ লাখ ২৩ হাজার ব্যারেলে উঠতে পারে বলে কেপলারের ধারণা, তবে আগস্টে এ পর্যন্ত তা নেমে এসেছে দৈনিক ৫ লাখ ৩৪ হাজার ব্যারেলে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীন গড়ে দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছিল।
এদিকে বৃহস্পতিবার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর’ নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, বিস্তারিত সোমবার জানানো হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলো নতুন করে সতর্ক হয়ে পড়েছে, কারণ নির্দিষ্ট ক্রেতাকে লক্ষ্য করে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। তবে একটি শোধনাগারের একটি সূত্র বলেছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা কেনাকাটা খুব বেশি থামাবে না; আগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া শোধনাগারগুলোও ইরানি তেল প্রক্রিয়াকরণ চালিয়ে গেছে।
২০২৫ সালের কেপলার তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরানের পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে। বেজিং বলেছে, তারা একতরফা নিষেধাজ্ঞা মানে না, এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সংঘাত মেটানো যাবে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জুলাই ২০১৯-এ যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরও কড়া করার পর ইরানের তেল রপ্তানি নেমে আসে দৈনিক ১ লাখ ব্যারেলে এবং চীন সাময়িকভাবে কেনা বন্ধ করে দেয়। পরে সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ সৌদি আরবের আবকাইকে ড্রোন হামলার প্রসঙ্গ টেনে বিশ্লেষকদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে পশ্চিমা আর্থিক চাপ বাড়লে ইরান ও তাদের মিত্রদের পক্ষে পরিস্থিতি জটিল করার সক্ষমতা আছে।





