এক বছরের বেশি বেতন নেই; তবু স্কুলে যান দক্ষিণ সুদানের এই শিক্ষকরা, কারণ কী?

স্কুলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইমন ওবা
বিদেশে এখন
0

দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবায় গাম্বো বেসিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক পল সান্তিনোর কর্মজীবন অনেকটা অন্য শিক্ষকদের মতোই। প্রতিদিন তিনি স্কুলে যান, শ্রেণিকক্ষ ঘুরে দেখেন, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও পোশাকের বিষয়ে খোঁজ নেন। পার্থক্য হলো—এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি কোনো বেতন পান না। শুধু তিনি নন, স্কুলটির কোনো শিক্ষকই বেতন পাচ্ছেন না। দেশটির অন্য সরকারি স্কুলের শিক্ষকদেরও একই অবস্থা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

দক্ষিণ সুদানের শিক্ষা খাত এখন গভীর সংকটে। ২০১১ সালে দীর্ঘ স্বাধীনতাযুদ্ধের পর দেশটি স্বাধীন হয়। আফ্রিকার সবচেয়ে ভঙ্গুর দেশগুলোর একটি দক্ষিণ সুদানের সরকারি কোষাগার প্রায় খালি। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৮ বছর বা তার কম। অথচ বছরের পর বছর শিক্ষা খাতে সরকারের বাজেট বরাদ্দ অত্যন্ত কম।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার বয়সী শিশুদের মাত্র ৪০ শতাংশ স্কুলে ভর্তি হয়। তাদেরও খুব অল্পসংখ্যক পড়া, লেখা ও গণিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

দাতাদের কাছ থেকে সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটির অনেক স্কুল প্রায় অর্থহীন অবস্থায় চলছে। এসব প্রতিষ্ঠান টিকে আছে মূলত শিক্ষকদের দায়িত্ববোধের কারণে। ৬৭ বছর বয়সী সান্তিনো বলেন, ‘আমি আমার কাজকে খুব বেশি ভালোবাসি।’ তাই বেতন না পেলেও তিনি প্রতিদিন স্কুলে যান।

প্রতিদিন ভোরে সান্তিনো প্রায় ৬ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যান। বিকেলে স্কুল বন্ধ করে আবার হেঁটে বাড়ি ফেরেন। স্ত্রী ও ছয় সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে তিনি খরচ কমিয়ে দিয়েছেন। কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা শিক্ষকদের সামান্য অর্থ সহায়তা দেন।

সরকারি ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক

দক্ষিণ সুদানের শিক্ষা খাতের এই দুরবস্থা নিয়ে বিদেশি সহায়তা দেশটির জন্য কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে এখনও বিতর্ক চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, বিদেশি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দক্ষিণ সুদানের নেতারা শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেননি।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, দেশটির শিক্ষা খাতের দুরবস্থার জন্য দাতাদের অর্থের ঘাটতি দায়ী নয়। বরং মৌলিক সেবা দিতে সরকারি সম্পদ ব্যবহারে সরকারের ব্যর্থতাই এর কারণ। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শিক্ষা খাতে ব্যয় করা যেত এমন বিপুল তেল রাজস্ব দেশটির নেতারা অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন এবং বিদেশি সহায়তাকে ‘সুশাসনের বিকল্প’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

দক্ষিণ সুদানের তথ্য মন্ত্রী আতেনি ওয়েক আতেনি এ সমালোচনার তাৎক্ষণিক জবাব দেননি। তবে তিনি বলেন, ‘সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। বেতন না পেলেও শিক্ষকেরা দায়িত্ব পালন করে জাতীয় গর্বের পরিচয় দিচ্ছেন।’

একটি শ্রেণিকক্ষে ৮৭ শিক্ষার্থী

দেশটির অন্য অনেক স্কুলের তুলনায় গাম্বো স্কুলের কিছু সুবিধা আছে। দুপুরে সেখানে শিশুদের গরম খাবার দেয়া হয়। শিক্ষকদের সামান্য ভাতা দিতে অভিভাবকেরাও সহযোগিতা করেন।

তবে এখানেও সংকট প্রকট। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে গড়ে ৮৭ জন শিক্ষার্থী। স্কুলের আঙিনায় নলকূপ থেকে লবণাক্ত পানি আসে। সেটি মেরামতের মতো অর্থও নেই। দক্ষিণ সুদানের একটি বেসরকারি সংস্থার নীতি বিশেষজ্ঞ মানুয়েলা তিয়ু বলেন, ‘স্কুলে উপস্থিতি শিশুদের জোরপূর্বক শ্রম ও বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করে। দীর্ঘ সংঘাত ও গৃহযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্কুল শিশুদের একটি স্থিতিশীল পরিবেশও দেয়।’

কিন্তু অর্থের অভাবে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। কোথাও কোথাও গাছের নিচে শিশুদের ক্লাস করতে হয়। শিক্ষকেরাও বাধ্য হয়ে পড়াশোনার বদলে শিশুদের মানসিক সুস্থতা ও খেলাধুলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

স্বাধীনতার স্বপ্নে ধাক্কা

দক্ষিণ সুদানের অনেকের কাছে শিক্ষাব্যবস্থার এই ভাঙন স্বাধীনতার স্বপ্ন নষ্ট হওয়ার প্রতীক। স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতা জন গারাং মনে করতেন, অস্ত্রের মতোই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ইথিওপিয়ায় সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরেও যোদ্ধাদের পড়াশোনা শেখানো হতো।

২০১১ সালে স্বাধীনতার পর দক্ষিণ সুদানে একটি মুক্ত ও সবার জন্য উন্মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশও সেই স্বপ্নকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর একের পর এক সংকট দেশটির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট সালভা কির ২০১১ সাল থেকেই ক্ষমতায় আছেন। ২০১৮ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হলেও তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ জনগণের সেবা, বিশেষ করে শিক্ষা খাতে ব্যয় না করে রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে দেশটিতে আবারও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে নতুন করে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ায় দক্ষিণ সুদানের জন্য আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে জুবায় গাম্বো স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে সংকট আরও তাৎক্ষণিক। ২৩ বছর বয়সী সাইমন ওবা স্কুলটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দেন। অভিভাবকদের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়ে তিনি জুবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার খরচ চালান।

প্রতিদিন সকালে নিজের তৈরি কাদামাটির ঘর থেকে হেঁটে স্কুলে যান ওবা। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে রান্না করেন এবং মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করেন। তার স্বপ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত, বিজ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষক হওয়া। ওবার ভাষায়, ‘শিক্ষা ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। সবকিছুর চাবিকাঠি এটি।’

এএম