নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির অংশে এখন পর্যন্ত ১৭৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও গোর্খা জেলাতেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। অন্যদিকে তিব্বতের গিরোং কাউন্টিতে এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি।
নিখোঁজ শত শত তীর্থযাত্রী ও কর্মী
কৈলাশ মানসরোবরের উদ্দেশে রওনা হওয়া শত শত বিদেশি পর্যটক ও তাদের গাইডের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে শতাধিক ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, ১২ জন ব্রিটিশ, ৮ জন দক্ষিণ কোরীয়, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান এবং যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ক্যানাডা ও নেদারল্যান্ডসের নাগরিক রয়েছেন।
পর্যটকদের পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণে যুক্ত কর্মীরাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। লাংতাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গের ভেতরে কর্মরত ৩৫ জন শ্রমিকসহ মোট ৬০ জন কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া রাসুয়ার তিমুরে এলাকা থেকে শুল্ক বিভাগের ১৫ জন কর্মকর্তা এবং নেপাল পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ৩২ জন সদস্যের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস
শুরুতে ভূমিকম্পের কারণে বন্যা হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও ইউএসজিএস তাদের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, ঘটনার কয়েক মিনিট আগে ভূকম্পন তরঙ্গ রেকর্ড হলেও তা কোনো ভূমিকম্প ছিল না। মূলত বিশাল আকারের বরফের চাঙ্ক ভেঙে পড়ার আঘাতেই সেই ভূকম্পন তৈরি হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ সাইমন কুক জানান, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পাহাড়ি এলাকার পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ী বরফের স্তর গলে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দ্বিতীয় দফার বন্যার আশঙ্কা
কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) সতর্ক করে জানিয়েছে, পাহাড়ি নদীগুলোতে হিমবাহের সঙ্গে নেমে আসা পাথর, কাদা ও বরফের স্তূপ আটকে কৃত্রিম হ্রদের তৈরি হয়েছে। এগুলো ভেঙে গেলে নিম্নাঞ্চলে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
বন্যার তোড়ে পাহাড়ি ত্রিশূলি নদী বিপজ্জনক রূপ নিয়ে রাস্তাঘাট, ঝুলন্ত সেতু ও বহুতল ভবন ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ত্রিশূলি এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেপালের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১২ শতাংশের বেশি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহার রাজ্যেও বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে আবহাওয়ার বাধা
দুর্গত এলাকায় তল্লাশি চালাতে নেপাল সেনাবাহিনী ২ হাজার সেনাসদস্য ও অন্তত ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে। সেখান থেকে এ পর্যন্ত ৯৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে সুউচ্চ পাহাড়ি দুর্গম পথ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টার চলাচলে চরম বিঘ্ন ঘটছে।
তিব্বত সীমান্ত অংশে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে পানির সমতা বজায় রাখতে এবং বাধাগ্রস্ত নদী পরিষ্কার করতে ৫৭৪ জন উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন।
বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা দালাই লামা এক বিবৃতিতে নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, ‘এই অঞ্চলটিতে আগেও দুর্যোগ দেখা গেছে। নিঃসন্দেহে এগুলো গভীর কোনো মূল কারণের লক্ষণ—তা জলবায়ু পরিবর্তনই হোক বা অন্য কোনো কারণ।’





