বাংলাদেশের জেন-জিদের প্লেলিস্টে রাজত্ব করছে পাকিস্তানি গান, কেন?

আতিফ আসলাম
বিদেশে এখন
0

গত ২৪ জুলাই সন্ধ্যার ঘটনা। টানা বৃষ্টিতে ঢাকার মাদানি এভিনিউয়ের কনসার্ট প্রাঙ্গণ থইথই। ভারী বৃষ্টিতে ভিজে একাকার শত শত মানুষ। তবুও অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে যাননি কেউ, বরং ভিড় আরও বাড়ছিল। তাদেরই একজন কুমিল্লা থেকে ১০৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসা ২২ বছরের তরুণ মোহাম্মদ আলিফ। পছন্দের শিল্পী আতিফ আসলামকে সরাসরি মঞ্চে গান গাইতে দেখাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।

রাত পৌনে নয়টার দিকে আতিফ আসলাম মঞ্চে উঠতেই হাজার হাজার তরুণের কণ্ঠে ভেসে আসে উল্লাস ধ্বনি। টানা দুই ঘণ্টা বৃষ্টির মধ্যে শিল্পীর সঙ্গে সুর মেলালেন পুরো প্রাঙ্গণের তরুণ-তরুণীরা। জেন-জি অর্থাৎ তরুণ প্রজন্মের কাছে পাকিস্তানি সঙ্গীতের এই আবেদন কেবল এক রাতের ঘটনা নয়। ভার্চুয়াল জগৎ থেকে শুরু করে কনসার্ট হল পর্যন্ত বাংলাদেশের তরুণদের দৈনন্দিন বিনোদনের বড় অংশ জুড়ে এখন অবস্থান করছে পাকিস্তানি গান।

দীঘদিন ধরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব বা স্পটিফাইতে আতিফ আসলাম, রাহাত ফাতেহে আলী খান কিংবা জালের গান শুনে আসছে বাংলাদেশের তরুণেরা। তবে বিগত দুই বছরে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক শিথিল হওয়ার পাশাপাশি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু হওয়ায় ঢাকার মঞ্চে সরাসরি গান পরিবেশনের সুযোগ বেড়েছে পাকিস্তানি শিল্পীদের।

২০২৪ সালের পর একাধিকবার ঢাকায় গান পরিবেশন করেছেন আতিফ আসলাম ও রাহাত ফাতেহে আলী খান। এছাড়া ব্যান্ডের মধ্যে ‘জাল’, ‘বায়ান’ এবং একক শিল্পী হিসেবে কাবিশ, আব্দুল হান্নান ও আইমা বেগ ঢাকায় এসে পারফর্ম করে গেছেন। তুলনামূলক চড়া দামের টিকিট কেটেও দূরদূরান্ত থেকে কনসার্ট উপভোগ করতে ছুটছেন তরুণ অনুরাগীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব জানান, সঙ্গীতের ক্ষেত্রে শ্রোতারা শিল্পীর নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট দেখেন না। তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন গান শোনে, তখন সেটা ভারতীয় নাকি পাকিস্তানি তা ভাবে না। গানের সুর, লিরিক এবং পরিবেশনার ধরনই মূল বিষয়। পাকিস্তানি গানে একধরনের ভিন্নতা রয়েছে, যা আমাদের তরুণদের দ্রুত আকৃষ্ট করে।’

অন্য একটি বড় কারণ হলো ‘কোক স্টুডিও পাকিস্তান’। এর সুবাদে কাওয়ালি, ফোক ও আধুনিক পপ সঙ্গীতের ফিউশন বাংলাভাষী তরুণদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তরুণ গায়ক অ্যাঞ্জেল নূর জানান, ভারতীয় সিনেমার মাধ্যমে অনেক গান পরিচিত পেলেও দিনশেষে সঙ্গীতের গুণগত মানই শ্রোতাদের ধরে রাখে। তিনি তার নতুন অ্যালবামেও পাকিস্তানি সঙ্গীতের কিছু ছোঁয়া রাখার চেষ্টা করেছেন।

গীতিকার ফয়সাল রাব্বিকীন মনে করেন, সহজ যোগাযোগ ও মুক্ত সংস্কৃতির বিকাশে এই বিনিময় স্বাভাবিক। তবে তিনি যোগ করেন, ‘সাংস্কৃতিক বিনিময় কখনো একপাক্ষিক হওয়া উচিত নয়। আমাদের দেশের শিল্পীদেরও পাকিস্তানে বা অন্যান্য দেশে নিয়মিত গিয়ে গান পরিবেশনের সুযোগ তৈরি হওয়া প্রয়োজন।’

টাকা খরচ আর দূরত্বের কষ্ট ভুলে পছন্দের শিল্পীদের এক নজর দেখা এবং সুরের মূর্ছনায় ভেসে যাওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে—সঙ্গীতের কোনো সীমানা নেই, আর তরুণরা কেবল ভালো গানকেই আপন করে নেয়।

—দ্য ডনের প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম