মিয়ানমারে রুশ বন্দর, বঙ্গোপসাগরে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

বঙ্গোপসাগর
বিদেশে এখন
0

মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূলে নির্মানাধীন রুশ সমুদ্রবন্দর দাওয়েই মেগাপ্রকল্পের কারণে জটিল হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি। এ বন্দর রাশিয়াকে আন্দামান সাগর হয়ে ভারত মহাসাগর ও মালাক্কা প্রণালিতে সহজে প্রবেশের সুবিধা দেবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাড়াবে রাশিয়ার প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু পশ্চিমাদেশের শঙ্কা, বন্দরটি প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে রুশ সাবমেরিন- যুদ্ধজাহাজের ট্রানজিট হিসেবে কাজ করবে। যা এ অঞ্চলে মার্কিন নিরাপত্তা কৌশলের ওপর সরাসরি হুমকি।

পশ্চিমা দেশ ও থিংক ট্যাংকগুলো বর্তমানে বঙ্গোপসাগরকে কেবল চীন-ভারত ও রাশিয়া বনাম পশ্চিমাদের বহুপক্ষীয় কৌশলগত প্রতিযোগিতার আসন্ন বলয় হিসেবে দেখছেন।

সম্প্রতি মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূলে আন্দামান সাগরের তীরে রুশ সমুদ্র বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দাওয়েই মেগাপ্রকল্পের নির্মান কাজ শুরু হয়েছে। যা রাশিয়াকে আন্দামান সাগর হয়ে ভারত মহাসাগর ও মালাক্কা প্রণালিতে সহজে প্রবেশের সুবিধা দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শঙ্কা, বন্দরটি প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে রুশ সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজের লজিস্টিকস হাব, ট্রানজিট বা পোর্ট অব কল হিসেবে কাজ করবে। যা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা কৌশলকে সরাসরি ব্যাহত করবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রুশ এ সমুদ্রবন্দরের কারণে বঙ্গোপসাগর ঘিরে জটিল হচ্ছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বাজার ব্যবস্থা। যে কারণে বঙ্গোপসাগর কেবল চীন-ভারত নয় বরং বহুপক্ষীয় কৌশলগত প্রতিযোগিতার বলয়ে রূপ নেবে।

পশ্চিমা থিংক-ট্যাংকগুলোর মতে, রাশিয়া এ বন্দর ব্যবহার করে মালাক্কা প্রণালিকে বাইপাস করে সরাসরি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে।

আরেকদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু পশ্চিমাদেশের শঙ্কা,নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রাশিয়া এ অঞ্চলে জ্বালানি হাব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তেল শোধনাগার এবং পেট্রোকেমিক্যাল হাব তৈরির পরিকল্পনা করেছেন পুতিন। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়া ভেনিজুয়েলা বা অন্যান্য অঞ্চলের অপরিশোধিত তেল এখানে পরিশোধন করে এশিয়ার বাজারে বিক্রি হবে।

মার্কিন সামরিক কৌশলে 'মালাক্কা চোকপয়েন্ট' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ অঞ্চলে মায়ানমার-রাশিয়ার জোটকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর করার একটি সুনির্দিষ্ট "টেস্টিং গ্রাউন্ড" হিসেবে দেখছে।

চীন-ভারতের পাশাপাশি মায়ানমারের সমুদ্র উপকূল ও লজিস্টিক অবকাঠামোতে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে রাশিয়া। ফলে বঙ্গোপসাগর কেবল চীন-ভারত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র থাকবে না বরং ত্রিমুখী বা বহুপক্ষীয় কৌশলগত বলয়ে রূপ নেবে।

রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজের মিয়ানমারের ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার এবং যৌথ নৌমহড়া ইন্দো-পেসফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়াবে।

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে রয়েছে চীনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প। একই রাজ্যে রয়েছে ভারতের সিত্তে সমুদ্রবন্দর ও কালাদান বহুমুখী পরিবহন করিডোর। এবার দেশটির দক্ষিণে আন্দামান সাগর উপকূলে যুক্ত হচ্ছে রাশিয়া।

দাওয়েই সরাসরি বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত না হলেও বঙ্গোপসাগর, আন্দামান সাগর, ভারত মহাসাগর ও মালাক্কা প্রণালি একই বৃহত্তর নৌ-বাণিজ্য ও সামরিক নিরাপত্তা বলয়ের অংশ। এ কারণে দাওয়েইয়ে রাশিয়ার সম্ভাব্য উপস্থিতি বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত হিসাবেও নতুন মাত্রা যোগ করবে ।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক আইএসইএএস ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল ফেলো ইয়ান স্টোরির মতে,শুধু শিল্প ও পরিবহন প্রকল্প থাকবে না। এটি ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের অবকাঠামো হিসেবেও বিবেচিত হবে।

এমন পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলে মস্কোর আগমন চীন-ভারতের জন্য সূক্ষ্ম কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। নয়াদিল্লির সঙ্গে মস্কোর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ভারত নিজস্ব আঙিনায় অন্য বহিঃশক্তির সামরিক পদচিহ্ন দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে কি না সেটিও বড় প্রশ্ন।

ইএ