জনমিতির ফাঁদে জেন-জি, পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া সংকটের বোঝা ফ্রান্সে তরুণদের কাঁধে

বিক্ষোভের সময় ফ্রান্সের পতাকা হাতে এক বিক্ষোভকারী
বিদেশে এখন
0

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দাবিতে ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজপথে বিক্ষোভ করছেন দেশটির স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তবে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে নামলেও বয়স্ক সমাজের ভিড়ে তরুণদের কণ্ঠস্বর কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জনমিতির পরিবর্তনের কারণে ফ্রান্সের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে তরুণদের আনুপাতিক উপস্থিতি তাদের বাবা-দাদাদের প্রজন্মের তুলনায় এখন অনেক কম। অ্যাসোসিয়েট প্রেসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাল দশা নিয়ে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন দ্রুতই রূপ নিয়েছে জীবনযাত্রার চড়া ব্যয় ও পুলিশের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে এক জাতীয় গণঅসন্তোষে। সার্বিয়া ও আলবেনিয়ার পাশাপাশি ভারত ও নেপালেও জেন-জি প্রজন্মের তরুণেরা সরকারবিরোধী আন্দোলনে বড় ভূমিকা রাখছেন। সম্প্রতি প্যারিসের উপশহর সেন-সাঁ-দেনির এক স্কুল বিক্ষোভে যোগ দিয়ে ২৩ বছর বয়সী সুইডিশ জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ জানান, বিশ্বজুড়েই তরুণদের এই জাগরণ দৃশ্যমান এবং এক মহাদেশের তরুণরা অন্য মহাদেশের আন্দোলনের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।

তবে সংখ্যার হিসাবে ফ্রান্সে তরুণরা আগের চেয়ে অনেক বেশি কোণঠাসা। ১৯৬৮ সালে যখন বিশ্ব কাঁপানো ঐতিহাসিক মে আন্দোলন হয়েছিল, তখন ফ্রান্সের জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ অর্থাৎ ৯৪ লাখই ছিল তরুণ ও কিশোর। বিপরীতে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ। বর্তমানে চিত্রটি পুরোপুরি উল্টো। ফ্রান্সে এখন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড় কোটিতে, যা মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। অন্যদিকে ১৩ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৬ লাখে, যা জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জন্ম নেয়া বেবি বুমার প্রজন্মের ব্যক্তিরা ইউরোপের যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ ভোগ করেছেন। সহজে কর্মসংস্থান, সস্তা বিমান ভ্রমণ ও স্নায়ুযুদ্ধের অবসান প্রত্যক্ষ করা এই প্রজন্ম ফ্রান্সে প্রায় নয় লাখ কোটি ইউরোর বিপুল ব্যক্তিগত সম্পদ জমিয়ে গেছেন, যা তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে বর্তমান তরুণদের জন্য তারা রেখে গেছেন লাগামহীন বৈশ্বিক উষ্ণতা, বিধ্বংসী জলবায়ু সংকট এবং ইউক্রেন ও ইরানের মতো অনিষ্পন্ন যুদ্ধ। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরাইলের বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন—সবাই এই বেবি বুমার প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত।

ফ্রান্সের জেন-জি প্রজন্মকে এখন টানতে হচ্ছে রেকর্ড সরকারি ঋণ ও জীবনযাত্রার চড়া ব্যয়ের বোঝা। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সরকারও শিক্ষার্থীদের দাবি সহজে মেটাতে পারছে না। ভাঙাচোরা ছাদ ও ইঁদুরের উপদ্রব থাকা স্কুলের সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তরুণদের ক্ষুব্ধ করে তুলছে। প্যারিসের রাজপথে নেমে আন্দোলনকারী তরুণরা জানান, তারা চরম অসহায় বোধ করছেন এবং তাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই।

এই পরিস্থিতিতে তরুণদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর জোরদার করতে ফ্রান্সে ভোটাধিকারের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছরে নামিয়ে আনার দাবি উঠেছে। বামপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশঁ এই প্রস্তাবের জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি তরুণদের অনাস্থার কারণে বয়স কমালেও তারা হয়তো রাজনীতিতে খুব বেশি আগ্রহী হবে না। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনে পুলিশি কাঁদানে গ্যাস সামলে ব্যারিকেড গড়ে তোলা এই তরুণরা জানান, কর্মজীবী মানুষের নিম্ন মজুরি ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধেই তাদের এই রাজপথের লড়াই।

এএম