মার্কিন সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার পথে ড. আবদুল এল-সায়েদ

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ
বিদেশে এখন
0

মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে প্রথম কোনো মুসলিম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল প্রার্থী ড. আবদুল এল-সায়েদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের উন্মুক্ত সিনেট আসনে অবসর নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের স্থলাভিষিক্ত হতে লড়ছেন ৪১ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তবে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান শিবিরের একের পর এক তীব্র ইসলামবিদ্বেষী ও রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ব্যক্তি আক্রমণের শিকার হয়েও নিজের অবস্থানে অবিচল থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাকে প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে এসে মার্কিন রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি।

অভিবাসী পরিবার থেকে যেভাবে উঠে এলেন

আবদুল এল-সায়েদের পুরো নাম আবদুলরহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদ। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর মিশিগানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক মিসরীয় অভিবাসী পরিবারে তার জন্ম হয়। ঘরে বড় হওয়ার সূত্রে তার প্রথম শেখা ভাষা ছিল আরবি। মিশিগানে বেড়ে ওঠার সময় সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাকে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে আরব ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব মাথাচাড়া দিলে শৈশবে তাকেও তীব্র কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মার্কিন সমাজের এসব বৈষম্য ও ক্ষত খুব কাছ থেকে দেখে বড় হওয়া এল-সায়েদ সবসময় সুযোগবঞ্চিত মানুষের অধিকারের পক্ষে কাজ করার অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন।

মেধার স্বাক্ষর ও জনস্বাস্থ্যে অনন্য ক্যারিয়ার

শিক্ষাজীবনে শুরু থেকেই মেধার অনন্য স্বাক্ষর রাখেন এল-সায়েদ। তিনি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেন। এরপর মর্যাদাপূর্ণ রোডস বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্যে ডক্টরেট (ডিফিল) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডক্টরেট (এমডি) ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

চিকিৎসক হিসেবে পড়ালেখা শেষ করলেও তিনি সরাসরি হাসপাতালে আবদ্ধ না থেকে জনস্বাস্থ্য নীতিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে ২০১৫ সালে তিনি চরম আর্থিক সংকটে দেউলিয়া হয়ে পড়া ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নেন। নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নগরীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যাপক সংস্কার আনেন, যার মধ্যে দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে চশমা দেয়া এবং স্কুলের পানিতে ক্ষতিকর সীসার উপস্থিতি পরীক্ষার কর্মসূচি বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় ১৮ লাখ বাসিন্দার কাউন্টি ওয়েইন–এর স্বাস্থ্য, মানব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সেবা দপ্তরের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মহামারিবিদ্যা বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন এবং জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় পডকাস্ট আমেরিকা ডিসেক্টেড পরিচালনার পাশাপাশি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বই লিখেছেন।

প্রগতিশীল রাজনীতিতে উত্থান

২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদের জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারিতে অংশ নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রথম নজর কাড়েন এল-সায়েদ। ওই নির্বাচনে প্রবীণ ডেমোক্র্যাট নেতা গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হলেও তরুণ ভোটারদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হন। ২০২৬ সালের সিনেট প্রাইমারিতে তিনি মধ্যপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী প্রগতিশীল নেত্রী অ্যালেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেজ এবং সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তার প্রধান সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হন।

এল-সায়েদ তার প্রচারণায় সবার জন্য নিখরচায় স্বাস্থ্যসেবা বা মেডিকেয়ার ফর অল নিশ্চিত করা, অভিবাসন তদারকি সংস্থা আইসিই বিলুপ্ত করা, শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ওপর জোর দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের কড়া সমালোচক। তিনি ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এবং প্রভাবশালী ইসরাইলপন্থী লবি সংস্থা আইপ্যাকের তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন। প্রচারের ক্ষেত্রে নিজেকে সমাজতন্ত্রী না বলে বরং করপোরেট প্রভাবমুক্ত পুঁজিবাদী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন এল-সায়েদ।

ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণ

মধ্যবর্তী নির্বাচন উপলক্ষে মিশিগানের পোর্ট হিউরনে রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের পক্ষে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে ট্রাম্প সরাসরি এল-সায়েদকে আক্রমণ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টার বক্তব্যে ট্রাম্প ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন যে এল-সায়েদ নির্বাচিত হলে দেশে শরিয়াহ আইন কায়েম করবেন এবং এমনটি হলে এল-সায়েদকেই প্রথম বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি ব্যঙ্গ করে আরও বলেন যে সিনেটে প্রবেশের আগে একমাত্র এল-সায়েদকেই মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা উচিত। এমনকি এল-সায়েদ ও ডেমোক্র্যাটরা বিজয়ী হলে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে এবং খ্রিষ্টানদের বড়দিনের উৎসব উদযাপন পর্যন্ত অসম্ভব হয়ে পড়বে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। পাশাপাশি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সও কোনো প্রমাণ ছাড়াই এল-সায়েদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুড, হামাস ও হিজবুল্লাহর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন।

আক্রমণের জবাব ও সিনেট নিয়ন্ত্রণের লড়াই

ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের তীব্র জবাব দিয়েছেন এল-সায়েদ। ডেট্রয়েটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় গ্যালনপ্রতি পেট্রোলের দাম প্রায় পাঁচ ডলারে ঠেকেছে, নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী এবং মানুষ বাড়িভাড়ার টাকা জোগাতে পারছে না। ট্রাম্পের তৈরি করা এসব অর্থনৈতিক সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে ঘোরাতেই এমন বানোয়াট আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এল-সায়েদ জোর দিয়ে বলেন, তার নাম কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে না, বরং সংকীর্ণমনা নেতাদের বিভাজনের রাজনীতির জবাব দিতে মিশিগানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই ভোটকেন্দ্রে যাবেন।

বর্তমানে ১০০ আসনের মার্কিন সিনেটে ৫৩টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে রিপাবলিকান পার্টি। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মিশিগানের এই লড়াই অন্যতম মূল কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক আক্রমণ আর ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এল-সায়েদের এই লড়াই এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনার সম্ভাবনায় রূপ নিয়েছে।

—আল জাজিরা ও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অবলম্বনে

এএম