বিচারিক আদালত কোনো ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিলেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা যায় না। একজন মানুষের জীবনের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে আইন একাধিক স্তরে বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ রেখেছে।
বিচারিক আদালতের রায় থেকে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স (Death Reference & High Court Appeal)
প্রথমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, দায়রা জজ আদালত বা সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত মামলার শুনানি শেষে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। রায় ঘোষণার পর দণ্ড অনুমোদনের জন্য সব কাগজপত্র ৩ কর্মদিবসের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠানো হয়, যাকে বলা হয় ‘ডেথ রেফারেন্স’ (Death Reference)। এ ক্ষেত্রে আসামির কোনো আলাদা আবেদনের প্রয়োজন হয় না।
- আসামির আপিল (CRPC Rules for Appeal): ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৩৭১ ও ৩৭৪ ধারার বিধানমতে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিপক্ষকে ৭ (সাত) দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে হয়।
- হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত: আসামি আপিল না করলেও হাইকোর্ট স্বয়ং সম্পূর্ণ নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ, তদন্ত ও নিম্ন আদালতের রায় বিবেচনা করে রায় দেন। হাইকোর্ট চাইলে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন, সাজা কমিয়ে দিতে পারেন অথবা আসামিকে খালাসও দিতে পারেন।
আরও পড়ুন:
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও রিভিউ আবেদন (Appellate Division & Review Petition)
হাইকোর্ট বিভাগে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয় না।
- আপিল বিভাগে আবেদন (Appellate Division Review): সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ মতে, সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না। আসামি কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে 'জেল আপিল' (Jail Appeal) এবং নিজস্ব আইনজীবীর মাধ্যমে 'নিয়মিত আপিল' করতে পারে। সাধারণত দুটি আপিল একসঙ্গেই শুনানি হয়।
- রিভিউ আবেদন (Review Petition): আপিল বিভাগে আবেদন খারিজ হলে আসামি শেষ আইনি পদক্ষেপ হিসেবে 'রিভিউ' (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করতে পারে। রিভিউ আবেদন খারিজ হলে সেই রায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, হাইকোর্ট, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিচারিক আদালত ও সংশ্লিষ্ট কারাগারে পাঠানো হয়।
মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রাণভিক্ষা (Mercy Petition to the President)
সব বিচারিক প্রক্রিয়া বা আইনি সুযোগ শেষ হওয়ার পর আসামির সামনে সর্বশেষ সুযোগ থাকে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ ও কারাবিধির (Jail Code Rule 991) ৯৯১ বিধি অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাওয়া।
রাষ্ট্রপতি যদি প্রাণভিক্ষার আবেদন নামঞ্জুর করেন, তবে সেই আদেশপ্রাপ্তির ২১ (একুশ) দিন থেকে ২৮ (আটাশ) দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আরও পড়ুন:
ফাঁসি কার্যকরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও নিয়মাবলী (Execution Rules under Jail Code)
রাষ্ট্রপতির আদেশ সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে পৌঁছানোর পর ফাঁসির পরোয়ানা জারি করে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ও কারাগারে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ কারাবিধির ৯৯৯ বিধি অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকরের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে এবং আত্মীয়স্বজনকে শেষ দেখা করার জন্য খবর দেয়।
- ফাঁসির সময় ও উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ: কারাবিধির ১০০০ বিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড রাতের যেকোনো সময় কার্যকর করা হয়। ১০৩ বিধি অনুযায়ী ফাঁসির সময় ম্যাজিস্ট্রেট, কারা কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও সিভিল সার্জন (ডাক্তার) উপস্থিত থাকেন।
- জল্লাদ ও দড়ির মাপ (Jail Code Rules for Execution): জল্লাদ (সহকারী) জেল সুপারের ইশারায় লিভার টেনে ফাঁসি কার্যকর করে। কারাবিধির ১০০৬ বিধি অনুযায়ী ২৫.৪ মিলিমিটার ব্যাসের ম্যানিলা দড়িতে ৩০ মিনিট ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার নিয়ম থাকলেও, ১০০৭ বিধি অনুযায়ী সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখাই মৃত্যু নিশ্চিতের জন্য যথেষ্ট। পরবর্তীতে সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম (Autopsy / Post-mortem) শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কেন বছরের পর বছর আটকে থাকে মৃত্যুদণ্ডের মামলা? (Reasons for Delay in Death Reference Cases)
বাংলাদেশে বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগার অন্যতম মূল কারণ উচ্চ আদালতে মামলার জট।
- ধারাবাহিক ক্রমানুসারে শুনানি: হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল মামলাগুলো ক্রমানুসারে (Serial basis) শুনানি হয়। পুরোনো মামলার দীর্ঘ সারির কারণে নতুন ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
- বিশেষ বেঞ্চের দাবি: আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর মামলাগুলোর জন্য পৃথক বিশেষ বেঞ্চ (Special High Court Bench) থাকা প্রয়োজন, যাতে দ্রুত ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন:
কঠোর শাস্তি নাকি বিচারের নিশ্চয়তা? (Severity of Punishment vs Certainty of Justice)
অপরাধবিজ্ঞানী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল শাস্তির কঠোরতা দিয়েই অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। অপরাধী যদি মনে করে সে ধরা পড়বে না বা বিচার এড়িয়ে যাবে, তবে মৃত্যুদণ্ড ও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। তাই দ্রুত তদন্ত, অপরাধ সনাক্তকরণ, নিরপেক্ষ বিচার এবং সাজা কার্যকরের নিশ্চয়তা তৈরি করাই অপরাধ দমনের মূল চাবিকাঠি।



