ভোটের আগে সিসিটিভি নিয়ে ‘হযবরল’, বিকল্পের খোঁজে সরকার

সিসিটিভি ক্যামেরা ও নির্বাচন কমিশনের লোগো
বিশেষ প্রতিবেদন
1

নির্বাচন কমিশন থেকে আছে নির্দেশনা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আছে বরাদ্দও। কিন্তু সরকারি দপ্তর থেকেই নোট দেয়া আছে কেনা যাবে না সিসিটিভি। এতে জেলা শিক্ষা অফিস কিংবা তৃণমূলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব পর্যায়ের কর্মকর্তা, কিংবা কর্তৃপক্ষ সবাই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের বাকি যখন আর মাত্র তিন সপ্তাহ, তখন আদৌ কি সিসিটিভি সংযোজন সম্ভব? উপদেষ্টা বলছেন, এখন সরকারিভাবে কিনতে গেলে লাগবে ৩ থেকে ৬ মাস, তাই অন্যভাবে ম্যানেজের চেষ্টা চলছে।

২০২১ সালের ১১ নভেম্বর। ভোটগ্রহণ শুরুর মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় দেশিয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে শুরু হয় সংঘর্ষ। আহত হন স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীসহ অনেকেই।

সেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ঠিক পাঁচ বছর পর আবার রামপ্রসাদ চরের সেই ভোটকেন্দ্রে একই ঘটনা। আমাদের আগ্রহ, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কতটা পরিবর্তন হলো, নির্বাচন কমিশনের বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ এ ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

মেঘনা পাড়ের চার চালার দুইটি টিনের ঘর। ঘরগুলো মূলত কুমিল্লা ১ আসনের ১০১ নম্বর ভোটকেন্দ্র রামপ্রসাদেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই, নড়বড়ে টিনের বেড়ায় কোনোমতে ঝুলে আছে জং ধরা জানলা। দুইটি স্কুল ঘরের দুই বারান্দায় লাগানো আছে দুই সিসিটিভি ক্যামেরা। কিন্তু তা সচল তো?

এ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা তানজিনা শারমিন জানাচ্ছিলেন, ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারির নির্বাচনের কয়েকদিনের আগে এ সিসিটিভি ক্যামেরা তাদের লাগাতে হয়েছিলো একদিনের নোটিশে, স্কুলের জমানো ফান্ড ব্যবহার করে। কারণ কেন্দ্র থেকে জরুরি ভিত্তিতে এটি করার নির্দেশ এসেছিলো, যেভাবে এবার কোনো নির্দেশনা আসেনি।

প্রধান শিক্ষিকা তানজিনা শারমিন বলেন, ‘এবারের নির্দেশনায় বলা হয়েছে অফিস থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে হবে। এখন আমাদের অফিস নাকি নির্বাচন অফিস সেটি আমরা জানি না। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে হবে এটি জানানো হয়েছে।’

আরও পড়ুন:

নামে মাত্র হলেও আগের আমলে লাগানো কিছু সিসিটিভি কিছু ভোটকেন্দ্রে তবু আছে। কিন্তু শিবপুর উপজেলার ভরতেরকান্দ্রি সরকারি প্রাইমারি স্কুলে নেই সেটিও। ভোট ডাকাত ধরার এই সহজলভ্য যন্ত্রটির সঙ্গে নেই, সীমানা প্রাচীরও। একইভাবে সিসিটিভি নেই সীমান্তবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কোমল্লা মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়েও। এবং এভাবে একইচিত্র দেখা গেছে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে। সবাই জানেন বরাদ্দ আছে কিংবা আসবে। কিন্তু আসেনি।

উপজেলা কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের সংস্কারের জন্য সরকার কিছু বরাদ্দ দিয়েছে। সিসিক্যামেরা অবশ্যিই থাকতে হবে।

নরসিংদী জেলার নির্বাচন কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা হয়, এ জেলার কতটি স্কুলের সিসিটিভি সচল আছে? দিতে পারেন নি সুনির্দিষ্ট তথ্য।

নরসিংদী জেলার নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, ‘৬৬৩টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৫টি কেন্দ্রে সিসিটিভি রয়েছে। এরমধ্যে আবার দেখা যায় কোনো কেন্দ্রের সিসিটিভি ক্যামেরা আছে তবে পাঁচটি সচল আছে আবার পাঁচাটি সচল নেই। নির্বাচনের আগে কতটুকু বাস্তবায়ন হবে বলা কঠিন তবে আমরা আশাবাদী।’

এটা ঠিক নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা কাগজে-কলমে দেখানো হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগকে পাঠানো ওই বার্তায় যেসব বিষয়ে বলা হয়েছে, তার অন্যতম ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি সংযোজন নিশ্চিত করা। যদিও জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও বলছেন, এ সংক্রান্ত কোনো সরকারি নির্দেশনা তারা পাননি।

কুমিল্লা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাপস কুমার পাল বলেন, ‘এখানে একটু সমস্যা হয়েছে। আমাদের তো টাকা দেয়া হয়েছে। তবে সেখানে লিখে দিয়েছে সিসি ক্যামেরার জন্য টাকা খরচ করা যাবে না।’

এ অস্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয় পরিবেশ উপদেষ্টাকে।

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যদি সরকারিভাবে কিনতে যাই তিন থেকে ছয় মাসের আগে হবে না। ফলে স্থানীয় তারাই যদি কিনে ফেলে তাহলে আমরা এটলিস্ট ৯০ শতাংশ কভারেজ দিতে পারব। এটি গড়িমসির ব্যাপার না। প্রক্রিয়া যা ফলো করতে হবে এই ব্যাপার।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা আর নথিগত নির্দেশনার পার্থক্য সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা তৈরি করছে।

রাজনীতি বিশ্লেষক কাজী মাহবুব বলেন, ‘দেড় বছর সময় পেয়ে নির্বাচনে ঘাটতি রাখবেন কেন আপনি? তাহলে এটি আপনার অদক্ষতা। আপনি নিজে পারছেন না বিধায়। না পারলে পদে থাকেন কেন? যদি এ ক্যামেরার কারণে নিরাপত্তা বলেন কারচুপি বলেন এসব ক্ষেত্রে যদি কোনো প্রবলেম তৈরি হয় তাহলে তো কেউ আপনাকে ছাড়বে না।’

সারাদেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রকে যেভাবে লাল, হলুদ ও সবুজ শ্রেণিতে ভাগ করেছে নির্বাচন কমিশন সেখানে দেখা গেছে, প্রায় ৯ হাজার ভোটকেন্দ্র সীমান্ত অঞ্চল, দুর্গম এলাকা এবং রাজনৈতিক সংঘাতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। হলুদ চিহ্নিত অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ আছে আরও ১৬ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র। নির্বাচনের ঠিক পূর্বমূহুর্তেও যেভাবে এসব ভোটকেন্দ্রকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আনা যাচ্ছে না, সেখানে নির্বাচনটি আসলে কেমন হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষজ্ঞরা।

এফএস