পরিকল্পনার অভাব নাকি জনসংখ্যা বৃদ্ধি? মিরপুরের পানি সংকটের আসল কারণ কী?

ওয়াসা ভবন
দেশে এখন
0

তীব্র পানি সংকটে মিরপুরের শেওড়াপাড়াসহ আশেপাশের এলাকা। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক মাস ধরে ঠিকমতো নেই পানি সরবরাহ। দিনে মাত্র একবার পানি আসে, তাও খুব কম সময়ের জন্য। অনেক সময় আবার দুই-তিনদিনেও পানির দেখা মেলে না। সংকটের জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ন আর জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে কারণ বলছে ওয়াসা। তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ওয়াসার কাঠামোগত সমন্বয়হীনতা আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবেই তীব্র হচ্ছে সংকট।

মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাজমা আক্তার বাবলি। এই গৃহিণীর দিন শুরু হয় পানির চিন্তায়, শেষও হয় সেই একই দুশ্চিন্তায়। ওয়াসার সরবরাহ লাইন থাকলেও নিয়মিত পানি না আসায় প্রতিদিনের রান্না, গোসল থেকে শুরু করে খাবার পানি সংগ্রহ করাই তার কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বড় লড়াই।

শুধু নাজমা আক্তার বাবলি নন, এই ভোগান্তি যেন মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মনিপুর ও পীরেরবাগের প্রতিটি ঘরের নিত্যদিনের গল্প।

স্থানীয়রা জানান, কেউ একদিন পরে, দুইদিন পরে, একদিন পরে পায়। ওই পাওয়া তো পাওয়া না। তো এইভাবে চলতেছে আরকি।

ওয়াসার হিসেবে, একজনের দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ১৫০ লিটার। সে অনুযায়ী মিরপুর এলাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ১৫ কোটি লিটার। শুষ্ক মৌসুমে মিরপুর ও আশেপাশের এলাকায় প্রতি মিনিটে প্রায় ১৮ হাজার লিটার পানির চাহিদা তৈরি হয়। ফলে এসময়, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর ও পীরবাগের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তীব্র হয় সংকট।

মিরপুর এলাকায় হঠাৎ জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে ওয়াসা। সংস্থাটির ভাষ্য, মেট্রোরেল চালুর পর এই এলাকায় জনসংখ্যা বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। সেই সাথে বেড়েছে নতুন বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক ভবন, ফলে দিন দিন জটিল হয়েছে পরিস্থিতি। তবে ওয়াসার দাবি, স্বল্পমেয়াদী উদ্যোগের সুফল মিলবে কয়েকদিনের মধ্যেই।

ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল হক বলেন, ‘অলরেডি আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেছে যে লাইনের যে এক ছোট্ট একটা কানেকশন শুধু দরকার এবং সেই কানেকশনটা হলে আমাদের যেটা সাভার লাইন থেকে আমাদের যে পানিটা আসতেছে, যে ফ্লো-টা, সেখান থেকে আমরা প্রায় অতিরিক্ত আরও ২৮ লাখ ৮০ হাজার লিটার প্রতিদিন হলো আমাদের যে নেটওয়ার্ক আছে, সে নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে। যে পানিটা অতিরিক্ত প্রতিদিন যুক্ত হলে আর আশা করি মিরপুর এলাকায় কোন সমস্যা থাকবে না।’

ভোগান্তির পেছনে কাঠামোগত সমস্যাকেই দায়ী করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা আর ওয়াসার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবেই বারবার নিতে হচ্ছে জোড়াতালি সমাধান।

নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘পরিকল্পিত নগরায়নের স্বার্থে ড্যাপ অনুযায়ী যা যা প্রস্তুতি নেয়া দরকার, সেই অনুযায়ী ওয়াসা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছে কিনা, সে প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে। কারণ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের থেকে অর্থ নিয়ে, বিভিন্ন সংস্থা থেকে বাংলাদেশের জনগণের নামে অর্থ নিয়ে, বিপুল অর্থের অপচয় করছেন।’

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘মেট্রোরেল হওয়ার পরে সেখানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করে সেখানে আরও বেশি জনসংখ্যা আসার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাহলে মিরপুর যেখানে ধারণক্ষমতার চার-পাঁচ গুণ জনসংখ্যা এমনিতেই আছে, তাহলে সেখানে যখন আরও মানুষ বাড়বে, তাহলে মাটির নিচ থেকে খালি বারংবার পানি তুলে তো আপনি এটা সাপ্লাই দিয়ে শেষ করতে পারবেন না। প্রয়োজন ছিল আমাদের পপুলেশন ডিস্ট্রিবিউশন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করা, যেন এই এলাকাতে মেট্রোরেলের সুবিধা এই এক্সিস্টিং এলাকাবাসী নিতে পারে।’

ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩শ’ কোটি লিটার। এই চাহিদা মেটাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা ওয়াসা স্থাপন করেছে প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ, যার মধ্যে শুধু মিরপুর জোনেই রয়েছে প্রায় ১৮০টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নলকূপ বসিয়ে নয়, প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সমাধান।

ইএ