বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: পুরনো কাঠামো বনাম নতুন বাস্তবতা

প্রতীকী ছবি
দেশে এখন
0

কূটনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু নেই। নেই চিরস্থায়ী বন্ধুও। বাংলাদেশ-ভারত দু’দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কের ওঠানামা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের অভিমত, ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রিক দু'দেশের সম্পর্ক আগের মতো থাকলেও রাজনৈতিক নানা হিসেব-নিকেশ সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। যার মূলে আছে শেখ হাসিনা ইস্যু। দিল্লির আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে দু’দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন সম্ভাব্যতাও দেখছেন তারা।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন কেমন? সেই প্রশ্নের উত্তরে ‘ভালো নাকি খারাপ’ এক কথায় এই উত্তর মেলা ভার। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরাও

মনে করছেন, বাংলাদেশে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চরম বাস্তবতা বুঝতে চাইছে না ভারত। এখনো আওয়ামী লীগকে মিত্র ধরে নিয়ে এগোতে চাইছে দেশটি। ভারতের সম্প্রতি শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে দেওয়া তারই নমুনা। আর পুরনো এই কাঠামোতে বাংলাদেশকে দেখার কারণেই হোঁচট খাচ্ছে সম্পর্কের স্বাভাবিক গতি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আগের ফ্রেমের মধ্যে যখন হাঁটতে চাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ থমকে যাচ্ছে। কারণ আমরা তো সেই ফ্রেমে হাঁটতে রাজি না। এবং সেই জন্য আপনি কখনো দেখছেন যখন বক্তব্য আসছে, তখন আসছে দুই দিক থেকে, হ্যাঁ, আমরা স্বাভাবিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাই। কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ভিত্তিটা কি এখনকার? এই যে নতুন ভিত্তি বা নতুন কাঠামো, এই জায়গাটা সাজাতে আমার ধারণা এই মুহূর্তে এখনো সাজানোটা ঐভাবে আসছে না।’

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিকে বহুমাত্রিক দাবি করে এই বিশ্লেষক মনে করেন, এরমধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকঠাক থাকলেও স্বাভাবিক নেই একে-অপরের রাজনৈতিক চাওয়া। তবে, কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় স্থিতিশীল না হলে, অদূর ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সম্পর্কেও ছেদ পড়তে পারে এমন শঙ্কাও আছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যেকোনো দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে একাধিক ধাপ থাকে। রাজনীতির যে একটা ধাপ থাকে, রাজনীতির ধাপ; আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের ধাপ থাকে; আবার সংস্কৃতির ধাপ থাকে; এমনকি শিক্ষারও ধাপ থাকে। তো আমি যদি বিভিন্ন ধাপ দেখি, প্রত্যেকটা ধাপেই যে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে এটা বলা ঠিক হবে না।’

এদিকে, সেপ্টেম্বরে ভারতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে বিমসটেক সভাপতি হিসেবে মাস খানেক আগেই নিমন্ত্রণ পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাকে ভারতে নিতে দেশটির হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক দৌড়ঝাপ কিংবা গণমাধ্যমে অভিব্যক্তি প্রকাশ বলে দিচ্ছে, সফর নিয়ে কতটা আগ্রহী ভারত।

এমন প্রেক্ষাপটেও, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত যাবেন কিনা তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে সফরে গেলে দু'দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারায় ফেরার সূচনা হতে পারে বলে মত দিচ্ছেন তারা।

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ব্রিকসে যদি আমি না যাই, মনে হবে যে পুরো পররাষ্ট্রনীতিতেই আমি ঐ ভারতকেন্দ্রিক করে ফেললাম। বরং যে বিভিন্ন দেশের সাথে সাইড মিটিং হতে পারে, ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানো যেতে পারে এবং ভারতের সাথেই যে সমালোচনা বা যে দ্বন্দ্ব সেটা বজায় রাখা যেতে পারে এবং সামনাসামনিও দেখা হলেও বলা যেতে পারে সাইড মিটিংয়ে।’

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভারতের যে দিক থেকে বেশ আমরা উৎসাহ দেখতে পাচ্ছি যে তারা প্রধানমন্ত্রীকে চাচ্ছে দিল্লিতে যাওয়ার জন্য। এবং এটা ব্রিকসটা একটা উপলক্ষ। কিন্তু মূল বিষয়টা হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কিভাবে পুনর্বিন্যস্ত করে সামনের দিকে যাওয়া যায়। কারণ আমরা নিকট প্রতিবেশী, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আছে একটা।’

ভারতের দরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তা আর বাংলাদেশের দরকার বিনিয়োগ, এমন যুক্তিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন এ দুটোই হওয়া দরকার দু'দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

ইএ