রাশিয়া-ইউক্রেন, হামাস-ইসরাইল ও চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের টালমাটাল গোটা বিশ্ব। গত ৩ বছরে গাজা সংকট সমাধানে যুদ্ধবিরতিসহ বেশকিছু প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে। রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতার কারণে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও কোনো প্রস্তাব পাস করতে পারেনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ, হোঁচট খেয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। এখানেও অনেকটা নীরব দর্শকের ভূমিকায় নিরাপত্তা পরিষদ।
এমন অবস্থায় জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। যেখানে পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের ভেটো ক্ষমতায় ভেস্তে যাচ্ছে সব শান্তি প্রস্তাব। কারণ যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে ভেটো দেয়ার একটি বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের।
সাধারণ পরিষদের ভাষণে বিশ্ব শান্তি রক্ষার জাতিসংঘ দায়িত্ব পালনে অক্ষম বলে অভিযোগ করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। গোটা নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ও ভেটো ক্ষমতা বিলোপের আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, মুষ্টিমেয় ৫টি দেশের ইচ্ছার ওপর বৈশ্বিক সংকটের সমাধান ছেড়ে দেয়া অন্যায্য।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদের এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ১৯০টিরও বেশি দেশের ইচ্ছা পাঁচটি দেশের খামখেয়ালিপনার অধীনে রয়েছে। তা ন্যায্য নয় এবং পূর্ণ আস্থা স্থাপনেও সক্ষম নয়। বিশ্ব এই পাঁচটি দেশের চেয়ে বড় এই নীতি অনুসারে নিরাপত্তা পরিষদকে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে।’
আরও পড়ুন
একই সুরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানান। চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা নিরসনে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো অনেকটা পুরনো ও অকার্যকর। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য কাজ করছে না বলেও অভিযোগ তার।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন। নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো, যার মূল দায়িত্ব আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা তা ১৯৪৫ সালের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। আমাদের অবিলম্বে এটিকে এমন একটি কাঠামোতে রূপান্তরিত করতে হবে যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বর্তমান বাস্তবতাকে যথার্থভাবে প্রতিফলিত করে।’
নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ও ভেটো ক্ষমতা বাতিলে তাদের এই আহ্বান বাস্তবে পরিণত হবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে সন্দেহ। কারণ, আনুষ্ঠানিকভাবে ভেটো ক্ষমতা বাতিল করতে হলে জাতিসংঘ সনদে একটি সংশোধনী আনতে হবে। অনুচ্ছেদ ১০৮ অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের তিন ভাগের দুই অংশের অনুমোদন এবং পাঁচটি স্থায়ী সদস্যসহ জাতিসংঘের সব সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
২০১৫ সালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো নৃশংস বিষয়ে ভেটো ক্ষমতা স্থগিতে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল ফ্রান্স ও মেক্সিকো। সম্প্রতি এ উদ্যোগটি নতুন করে গতি পেয়েছে। গেল চার মাসের মধ্যে ৫টি স্থায়ী সদস্যসহ ২১টি দেশ এটিকে সমর্থন জানিয়েছে। এখন এতে মোট সমর্থনকারী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৮-এ। সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাসে প্রয়োজন আর মাত্র একটি দেশের সমর্থন।
অথচ ভেটো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। তুরস্কের প্রস্তাবের জবাবে রাশিয়া বলছে, নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। তবে অবশ্যই ভেটো ক্ষমতা রাখতে হবে।
ঐতিহাসিকভাবে, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভেটো দিয়েছে রাশিয়া। যা নথিভুক্ত মোট ভেটোর প্রায় অর্ধেক। ৯৫টি ভেটো দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র।





