রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ‘আধিপত্য’, জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা!

সংসদ ভবন
বিশেষ প্রতিবেদন
রাজনীতি
0

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া বেশিরভাগ প্রার্থীই পেশায় ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা এমপি হলে অনেকক্ষেত্রেই ব্যবসার স্বার্থে তার নীতি প্রণয়ন করেন তাতে বঞ্চিত হয় জনগণ, তৈরি হয় সিন্ডিকেট, জন্ম নেয় অলিগার্ক গোষ্ঠী। গণঅভ্যুত্থানের পরের রাজনীতিতেও গুণগত পরিবর্তন হয়নি বলেই পেশাজীবী মধ্যবিত্তরা মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীরা আবারো ক্ষমতায় গেলে মৃত্যু ঘটবে জুলাই বিপ্লবের।

চাকুরিতে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন, ৩৬ দিনের মাথায় রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে।

সেই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে মনোনয়নে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থীর কোন যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিলো সে প্রশ্ন উঠছে জনমনে। হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশিরভাগই মনোনয়ন পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

২৯২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার তালিকায় ব্যবসায়ী ১৭০ জন। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আছেন আইনজীবী, প্রকৌশলী ও শিক্ষকরা। হলফনামায় রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

হলফনামায় অনুযায়ী, জামায়াতের ২৭৬ প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ১৪৮ জন চাকরিজীবী, যাদের মধ্যে শিক্ষক অন্তত ৯২ জন। এর বাইরে আছেন চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা।

ব্যবসায়ীরা মনোনয়ন পেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা রাজনীতিবিদ। তবে, রাজনীতি না করেও অনেকে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। যা বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে অন্তরায় বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ যদি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মনোনয়ন পায় এবং এমপি হয়ে আসে তাহলে নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়াটা কিন্তু সে এমনভাবে প্রভাবিত করবে যেন ব্যবসায়ীদের পক্ষে যায়। তখন কিন্তু জনগণের অধিকার থাকে না। এটাই গত ১৫ বছর আমরা দেখেছি। অলিগার্কি, একটা সিন্ডিকেট। এবারও যদি এটা হয়, ডেটায় যদি প্রমাণিত হয় প্রধানত তারা ব্যবসায়ী আসলে তারা রাজনীতিবিদ না। তাহলে কিন্তু আমাদের চিন্তা করার বিষয় আছে। যে আপিলটা আমাদের ৫ আগস্ট ছিলো সেটা আবারও দূরে চলে যাচ্ছে।’

আরও পড়ুন:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়া ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫০১ জনই কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক। দল হিসেবে কোটিপতি প্রার্থী বেশি বিএনপিতে- ২শ ১২ জন। এর পরেই জামায়াতের অবস্থান, দলটির কোটিপতি প্রার্থী ৬৪ জন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৫, জাতীয় পার্টির ৩০ জনসহ বিভিন্ন দলে আছেন কোটিপতি প্রার্থী। এছাড়া সম্পদের শীর্ষ ২০ তালিকায় বিএনপির প্রার্থী ১৪ জন, স্বতন্ত্র ৪ এবং জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের একজন করে প্রার্থী রয়েছেন। এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, হলফনামায় কতটা সঠিকভাবে আসছে প্রার্থীদের আয়-ব্যয়ের তথ্য?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘তাদের সম্পদের উৎসের খোঁজ করলে দেখা যাবে সম্পদ ব্যবসা থেকে আসে নি। অন্য কোনোভাবে এসেছে যেটা বৈধ না। এ প্রক্রিয়ার সমস্যা হচ্ছে এদের হাতে বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু ঘটতে পারে। একজন ব্যবসায়ী যে মনোনয়ন পেতে পারেন না তা আমি বলছি না। তবে গত ১৬ বছরে তার ভূমিকা কি ছিলো? তিনি কি স্বৈরাচারের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিলেন?’

ব্যবসায়ীদের অর্থ উপার্জন কতোটা বৈধ সেই প্রশ্ন তুলছেন এই বিশ্লেষক। টাকার কারণে মনোনয়ন পেয়ে থাকলে তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যবসা নয় বরং সংসদ সদস্যদের গুরুত্ব দিতে হবে রাজনীতিতে। আগের মতো ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদরা জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ালে আবার অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সংসদ প্রতিনিধি করার জন্য আপনাকে কিছু যোগ্য লোক নিয়ে আসতে হবে। যারা আসলেই সাধারণ মানুষের বাংলাদেশের জন্য নীতি প্রণয়ন করতে পারবেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ওপরে পুরোপুরি বিশ্বাস করার কোনো কারণ দেখি না। আমি মনে করি ছাত্র জনতা যারা এ বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলো তাদের ভিজিলেন্স থাকতে হবে।’

বাংলাদেশে রাজনীতি এখনো পেশার মর্যাদা পায়নি। তবে অনেকেই মনে করেন, পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদদের দলীয় সম্মানীর আওতায় আনা গেলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে।

ইএ