রমজান: ধুমপান ও তামাক বর্জনের বড় সুযোগ

ধূমপানের কাফফারা কী
ধর্ম ও বিশ্বাস
0

পবিত্র রমজান মাস আত্মশুদ্ধি, ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়। এ মাসে মুমিন মুসলমানরা তাকওয়া অর্জনের লক্ষে পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকেন। তবে অনেক সময় ধূমপায়ীদের মনে প্রশ্ন জাগে—রোজা অবস্থায় সিগারেট খেলে (Smoking while fasting) রোজার কী হয়? ওলামায়ে কেরাম এবং ফাতাওয়া শাস্ত্রের আলোকে এর বিস্তারিত সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো।

ধূমপান ও রোজা ভঙ্গের কারণ (Reason for Breaking Fast)

ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছুর ধোঁয়া গলার ভেতরে প্রবেশ করালে রোজা ভেঙে যায়। ওলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন যে, সিগারেট খেলে (Smoking cigarettes) রোজা ভেঙে যাবে। কারণ, সিগারেট পানকারী ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এর নেশাযুক্ত ধোঁয়া গলা ও মস্তিষ্কে পৌঁছে দেন। ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ (৬: ৪১৫-৪১৬) অনুযায়ী, এটি রোজা ভঙ্গের স্পষ্ট কারণ।

আরও পড়ুন:

কাজা ও কাফফারা (Qaza and Kaffarah)

যদি কোনো ব্যক্তি রমজান মাসে রোজার কথা স্মরণ থাকা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে ধূমপান করেন, তবে তার ওপর ওই রোজার কাজা ও কাফফারা (Qaza and Kaffarah) উভয়ই ওয়াজিব হবে। অর্থাৎ, তাকে একটি রোজার পরিবর্তে একটি কাজা এবং নির্দিষ্ট নিয়মে কাফফারা আদায় করতে হবে।

অনিচ্ছাকৃত ধোঁয়া প্রবেশ (Unintentional Smoke Inhalation)

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, পাশে কেউ ধূমপান করলে সেই ধোঁয়া নাকে এলে কী হবে? বিধান হলো—যদি কোনো ব্যক্তি রোজাদারের পাশে সিগারেট পান করে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া গলার ভেতরে চলে যায়, তবে রোজা নষ্ট হবে না। কারণ, এটি থেকে সম্পূর্ণ বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তবে রোজাদার যদি ইচ্ছা করে সেই ধোঁয়া শ্বাসের মাধ্যমে ভেতরে টেনে নেন, তবে তার রোজা নষ্ট হয়ে যাবে এবং শুধু কাজা (Qaza) করা ওয়াজিব হবে।

ধূমপান ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি (Islamic View on Smoking)

ধূমপান ও তামাক সেবন কেবল স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং এটি একটি অপচয় (Wastage)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "নিশ্চয়ই অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই" (সুরা-১৭, আয়াত: ২৭)। এছাড়া ধূমপানের ফলে মুখে ও শরীরে যে দুর্গন্ধ তৈরি হয়, তা অন্যের কষ্টের কারণ হয়, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম।

আরও পড়ুন:

ধূমপান ও রোজা সংক্রান্ত জরুরি তথ্য

বিষয় (Subject) শরয়ি বিধান (Islamic Ruling)
ইচ্ছাকৃত ধূমপান রোজা ভেঙে যাবে; কাজা ও কাফফারা উভয়ই জরুরি।
অনিচ্ছাকৃত ধোঁয়া নাকে আসা রোজা ভাঙবে না; তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘ্রাণ নিলে রোজা নষ্ট হবে।
তামাক বা গুল ব্যবহার রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা ওয়াজিব হবে।
সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি ধূমপান অপচয় ও ক্ষতিকর বিধায় এটি হারাম।

রোজা ও ধূমপান সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর-FAQ

১. সিগারেট খেলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, সিগারেট বা বিড়ি পান করলে রোজা ভেঙে যায়। কারণ এর ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে গলার ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।

২. রোজা অবস্থায় ধূমপান করলে কি শুধু কাজা দিতে হবে?

উত্তর: না, যদি কেউ রোজার কথা স্মরণ থাকা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে ধূমপান করেন, তবে তার ওপর কাজা (একটি রোজা) এবং কাফফারা (টানা ৬০টি রোজা) উভয়ই ওয়াজিব হবে।

৩. পাশের কেউ ধূমপান করলে তার ধোঁয়া নাকে এলে কি রোজা ভেঙে যাবে?

উত্তর: যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া নাকে বা গলার ভেতরে প্রবেশ করে, তবে রোজা ভাঙবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ধোঁয়া নিশ্বাসের সাথে টেনে নিলে রোজা ভেঙে যাবে।

৪. ইলেকট্রনিক সিগারেট বা ভ্যাপ (Vape) পান করলে কি রোজা থাকে?

উত্তর: না, ইলেকট্রনিক সিগারেট বা ভ্যাপ ব্যবহার করলেও রোজা ভেঙে যায়, কারণ এর মাধ্যমেও নিকোটিনযুক্ত বাষ্প শরীরে প্রবেশ করানো হয়।

৫. তামাক, জর্দা বা গুল ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, তামাক, জর্দা বা গুল মুখে ব্যবহারের ফলে এর রস বা অংশ গলার নিচে নেমে যায়, ফলে রোজা দ্রুত ভেঙে যায়।

৬. ধূপ বা আগরবাতির ধোঁয়া কি রোজা নষ্ট করে?

উত্তর: অনিচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া নাকে এলে রোজা ভাঙবে না। তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আগরবাতি বা ধূপের ধোঁয়া নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ গ্রহণ করে, তবে তার রোজা ভেঙে যাবে।

৭. ভুলবশত সিগারেট খেয়ে ফেললে কি রোজা হবে?

উত্তর: যদি কেউ একেবারেই ভুলে যান যে তিনি রোজা রেখেছেন এবং সেই অবস্থায় ধূমপান করেন, তবে তার রোজা ভাঙবে না। তবে মনে পড়ার সাথে সাথেই তা ত্যাগ করতে হবে।

৮. ধূমপান করলে কি কাফফারা দেওয়া বাধ্যতামূলক?

উত্তর: ফাতাওয়া অনুযায়ী, রমজান মাসে ইচ্ছাকৃতভাবে ধূমপান করলে তা পানাহারের শামিল ধরা হয়, তাই এক্ষেত্রে কাজার পাশাপাশি কাফফারাও দিতে হয়।

৯. ইফতারের পর ধূমপান করা কি জায়েজ?

উত্তর: ইফতারের পর ধূমপান করলে রোজা ভাঙবে না ঠিকই, তবে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং অপচয় বিধায় এটি ইসলামে অত্যন্ত অপছন্দনীয় বা মকরুহ কাজ।

১০. নিকোটিন প্যাচ (Nicotine Patch) ব্যবহার করলে কি রোজা থাকে?

উত্তর: অনেক ওলামায়ে কেরামের মতে, চামড়ার মাধ্যমে নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করলে রোজা ভাঙে না। তবে এটি থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

১১. ধূমপানের দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে যাওয়া কি ঠিক?

উত্তর: ধূমপানের উৎকট দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে যাওয়া বা নামাজের কাতারে দাঁড়ানো নাজায়েজ, কারণ এতে অন্য মুসল্লি এবং ফেরেশতাদের কষ্ট হয়।

১২. রমজানে ধূমপান ছাড়ার ধর্মীয় গুরুত্ব কী?

উত্তর: রমজান হলো ধৈর্যের মাস। এই মাসে দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ধূমপান থেকে বিরত থাকার অভ্যাসকে কাজে লাগিয়ে স্থায়ীভাবে এই ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ করা সহজ হয়।

১৩. হুক্কা পান করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, হুক্কা পান করলে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা ও কাফফারা ওয়াজিব হয়।

১৪. রোজা অবস্থায় সিগারেটের ধোঁয়া গলার নিচে না নামালে কি রোজা হবে?

উত্তর: না, সিগারেটের ধোঁয়া মুখে নিলেই তা সূক্ষ্মভাবে গলার ভেতরে চলে যায়, তাই রোজা হবে না।

১৫. ধূমপান কি ইবাদত কবুলের অন্তরায়?

উত্তর: ধূমপান একটি গুনাহের কাজ। অনবরত গুনাহ করলে ইবাদতের মিষ্টতা ও সওয়াব কমে যায়, তাই রোজা কবুল হওয়ার জন্য সব ধরনের গুনাহ ও নেশা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।

এসআর