ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে বিপর্যস্ত দিনাজপুরের লিচু; হতাশ বাগান মালিকরা

দিনাজপুর
নষ্ট হওয়া লিচু ফুলের ছবি
এখন জনপদে , গ্রামীণ কৃষি
কৃষি
0

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। দিনাজপুর সদর উপজেলার মাহব্বপুর গ্রামের একটি লিচু বাগানে দাঁড়িয়ে লিচু বাগান মালিক বাবলু মিয়া একের পর এক গাছের দিকে তাকাচ্ছিলেন। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেসব ডালে লালচে-সবুজ গুচ্ছ দেখে তিনি লাভের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এখন সেখানকার অনেক লিচুই ঝরে পড়ে আছে মাটিতে। কিছু লিচু গাছেই ফেটে গেছে, কিছু পচে কালচে হয়ে গেছে। এ অবস্থায় তার কণ্ঠে হতাশা সুর স্পষ্ট।

‘মৌসুমের শুরুতেই গরমে মুকুল পুড়ে গেছে, এখন আবার ঝড়-শিলাবৃষ্টি। কোনোমতেই লিচু ধরে রাখা যাচ্ছে না।’—বলছিলেন তিনি।

শুধু বাবলু নন, দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ লিচু অঞ্চলজুড়ে এখন একই দৃশ্য। সদর, বিরল, চিরিরবন্দর, কাহারোল, খানসামা ও বোঁচাগঞ্জ—সবখানেই বাগানিদের চোখে এক ধরনের অজানা শঙ্কা। বাজারে লিচু উঠতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, কিন্তু প্রকৃতির একের পর এক আঘাতে এবার লাভের বদলে লোকসানের হিসাব কষছেন অনেকেই।

দিনাজপুরের লিচু শুধু একটি ফল নয়; এটি এ অঞ্চলের অর্থনীতি, ঐতিহ্য আর আবেগের অংশ। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশে রপ্তানি হয় এখানকার বোম্বাই, মাদ্রাজি ও চায়না-৩ জাতের লিচু। মৌসুম এলেই হাজারো শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবিকা ঘুরতে শুরু করে এ ফলকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এবার মৌসুমের শুরু থেকেই যেন দুর্ভাগ্য পিছু নিয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, প্রথমে ছিলো অনাবৃষ্টি ও তীব্র তাপমাত্রা। মার্চ-এপ্রিলেই তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৯ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। ভোরে কুয়াশাও ছিলো। এতে লিচুর মুকুল পুড়ে যায়। পরে শুরু হয় খরা। অনেক বাগানে পর্যাপ্ত সেচ দেয়ার প্রয়োজন হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে পানি তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

এরপর কিছুটা স্বস্তি এনে বৃষ্টি এলেও সেই স্বস্তি বেশিদিন টেকেনি। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসজুড়ে শুরু হয় কালবৈশাখি।

আরও পড়ুন:

বিরল উপজেলার রবিপুর এলাকার লিচু ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম এবার কয়েকটি বাগান লিজ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাগানে এখন গিয়েই ভয় লাগে। ভালো লিচুগুলোও ফেটে যাচ্ছে। কীটনাশক স্প্রে করছি, পরিচর্যা করছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হবে বুঝতে পারছি না।’

একই উপজেলার মাধববাটি গ্রামের খাদেমুল ইসলামের কণ্ঠে আরও বেশি হতাশা। তিনি বলেন, ‘গতবার গরমে লিচু গাছেই পুড়ে গিয়েছিলো। এবার ঝড়-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে এবারও লোকসান গুনতে হবে।’

গত কয়েক বছর ধরেই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে দিনাজপুরের লিচু চাষিদের। কখনো করোনার ধাক্কা, কখনো শিলাবৃষ্টি, আবার কখনো তীব্র তাপপ্রবাহ—প্রতিটি মৌসুমই যেন নতুন অনিশ্চয়তা নিয়ে আসছে।

ঢাকার ব্যবসায়ী আব্দুর হান্নান প্রতি বছরের মতো এবারও মাধববাটিতে বাগান কিনেছেন। কিন্তু এবারও তার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। তিনি বলেন, ‘গতবার দাবদাহে লিচু কালো হয়ে গিয়েছিলো। ১০০ টাকায় ১০০ লিচু বিক্রি করতে হয়েছিলো। এবার যদি এই ঝড়-বৃষ্টি চলতে থাকে, তাহলে লিচুর গোড়ায় পচন ধরবে।’

তার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—লোকসানের ধারাবাহিকতা। তিনি বলেন, ‘ভাবছিলাম এবার আগের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবো। এখন তো মনে হচ্ছে পুঁজি টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে যাবে।’

এছাড়া চাষিদের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা হলো পরিবহন ব্যয় ও সংরক্ষণ সংকট।

সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের জুয়েল ইসলাম তিন একর জমিতে লিচুর বাগান করেছেন। তিনি জানান, এবার ফলন গত বছরের প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে পরিবহন খরচ বেড়েছে, সামনে ঈদুল আজহা থাকায় যানজট ও গাড়ি সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘হিমাগার না থাকায় হাজার হাজার টন লিচু নষ্ট হয়ে যায় প্রতি বছর। সরকার যদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতো, তাহলে কৃষকের এত ক্ষতি হতো না।’

আরও পড়ুন:

যদিও কৃষি বিভাগ পরিস্থিতিকে এতটা ভয়াবহ বলতে রাজি নয়। দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলছেন, এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ সীমিত। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে এবং বাগানিরাও ব্যাপক পরিচর্যা করছেন। তাদের দাবি, উৎপাদন এখনো আশাব্যঞ্জক পর্যায়েই আছে।

এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তাপপ্রবাহে কিছু ক্ষতি হয়েছে ঠিকই, তবে খুব বেশি নয়। বাগানিরা যথেষ্ট পরিচর্যা করছেন। আশা করছি কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে।’

তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। অনেক বাগানেই এখন শ্রমিকরা ঝরে পড়া লিচু কুড়িয়ে সরাচ্ছেন। কোথাও কোথাও গাছের নিচে কাচা লিচুর স্তূপ জমে আছে। চাষিদের মুখে উদ্বেগ— আর কয়েকদিন যদি ঝড়-বৃষ্টি চলতে থাকে, তাহলে বাজারে ওঠার আগেই বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

আগামী ১৫ মে থেকে দিনাজপুরের লিচু বাজারে উঠতে শুরু করবে। কিন্তু এবারের মৌসুমে সেই আগমনের আনন্দের চেয়ে অনিশ্চয়তাই যেন বেশি।

দিনাজপুরের মানুষ জানে, লিচুর মৌসুম মানেই উৎসবের সময়। কিন্তু এবার সেই উৎসবের রং কিছুটা ফিকে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা চাষিদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন— এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তারা টিকে থাকতে পারবেন তো?

এসএইচ