পাহাড়ের নারীদের সচ্ছলতায় বড় বাধা মজুরি বৈষম্য

ধানের খেতে কাজ করছেন পাহাড়ি নারী শ্রমিকরা
ফিচার
এখন জনপদে
0

রাঙামাটি জেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের কুতুকছড়ি মধ্যপাড়ায় ধানের খেতে কাজ করছিলেন শ্রমিক কালিন্দীরানী চাকমা (৩৭)। বললেন, ‘আমাদের জায়গা-জমি নাই, গরীব মানুষ। ছয়জনের সংসার। কাজ না করলে কী খাবো? কিন্তু আমরা দৈনিক মজুরি পাই ৩৫০ টাকা। আর পুরুষরা পায় আমাদের ডাবল। সবকিছুর দাম বেশি, পোষায় না।’

শুধু কালিন্দীরানী চাকমাই নন, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, প্রকৃতির রূপ যেমনই থাকুক না কেন পরিশ্রম থেমে থাকে না পাহাড়ি নারীদের। পরিবারের খরচ চালাতে পুরুষের পাশাপাশি পাহাড়ি নারীরাও কঠোর পরিশ্রম করেন। জুম চাষাবাদ থেকে শুরু করে শ্রমিকের কাজেও সমান অবদান তাদের। পুরুষের সমান কাজ করলেও মজুরির বেলায় নারীরা পান পুরুষদের অর্ধেক মজুরি।

এমন বাস্তবতায় আজ (রোববার, ৮ মার্চ) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নানা আনুষ্ঠানিকতা আর উন্নয়নের পঙক্তিমালায় আলোচনার টেবিল সরগরম হয়ে উঠলেও ভাগ্য ফেরে না এই নারী শ্রমিকদের। কেবল সময়ের খাতায় যোগ হয় একেকটি বছর!

এমনকি- নারীদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে কৃষি প্রশিক্ষণ, নারী কৃষি কার্ড, ভর্তুকি সুবিধা, মহিলা উন্নয়ন প্রকল্প ও ডিজিটাল কৃষি তথ্য সেবায় সরকারি নানা উদ্যোগে- এসব নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত। এ অবস্থায় মজুরি বৈষম্যের নিরসন চান তারা।

আরও পড়ুন:

মধ্যপাড়ার শ্রমিক মিতা চাকমা (৩৫) বলেন, ‘বাজারে সবকিছুরই দাম বেশি। কাজ করে সংসার, বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়। মজুরি পুরুষের সমান হওয়া দরকার।’

কাজে কেন নারী? ক্ষেতের মালিক মিলে চাকমা (৫০) বলছেন, ‘পুরুষ শ্রমিকের মজুরি বেশি। কাজও কম করে, ফাঁকি দেয়। আর কম টাকায় নারী শ্রমিক পাওয়া যায়। কাজও বেশি করে, ফাঁকি দেয় না। এজন্য নারী শ্রমিকই নেই।’

আর ৪৫ কিলোমিটার দূরে নানিয়ারচর উপজেলার স্থানীয় আনারস বাগানের শ্রমিক সাগরিকা চাকমা (৩৫) বলেন, ‘রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করি। জ্বর, কাশিসহ বিভিন্ন রোগে ভুগি।।কী করবো, গরীব মানুষ। তাই মজুরি কম দিলেও আপত্তি করি না।’

আরও পড়ুন:

বসুন্ধরা চাকমা (২৭) বলেন, ‘পুরুষের সমান করেও মজুরি পাই অর্ধেক। আপত্তি করলে কাজ হারাবো। বিকল্প কাজের সুযোগও নাই। টাকা পয়সা না থাকায় নিজেরাও কিছু করতে পারি না। নতুন সরকার যেন বিষয়গুলোর ব্যবস্থা নেয়।’

জীবনমান উন্নয়নে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আধুনিক উদ্ভাবনী প্রশিক্ষণ আর উদ্যোক্তা তৈরিতে সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং জেন্ডার সমতা নিশ্চিতে মজুরি কাঠামোর দ্রুত বাস্তবায়ন চান- পাহাড়ের নারীরা।

আরও পড়ুন:

রাঙামাটির আইনজীবী ও নারী উন্নয়নকর্মী কক্সী তালুকদার বলছেন, ‘সরকারি বেসরকারি নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর মতো “মজুরি” কাঠামো না থাকায় প্রান্তিক পর্যায়ে নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সরকার মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে বৈষম্য কমে আসবে।’

রাঙামাটি জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক অনুকা খীসা বলছিলেন, ‘পাহাড়ের নারীদের আত্ননির্ভরশীল, স্বাবলম্বী ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড় তুলতে সরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মজুরি বৈষম্য নিরসনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

এসএস