৬৬০ প্রতিরোধ কমিটি; তিন বছরে নীলফামারীতে ঠেকানো গেছে মাত্র ১১ বাল্যবিবাহ

নীলফামারী
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ক্যাম্পেইন চলছে
এখন জনপদে
0

নীলফামারীতে বাল্যবিয়ের হার ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। জেলায় প্রতিরোধ কমিটি রয়েছে ৬৬০টি। যদিও গত তিন বছরে বন্ধ হয়েছে মাত্র ১১টি। সরকারি কমিটির পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কাজ করলেও কিছুতেই কমছে না এই সামাজিক ব্যাধি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পারিবারিক অস্বচ্ছলতা, নিরাপত্তাহীনতা, অসচেতনতা অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহে সহায়ক হচ্ছে।

বয়স আঠারো হবার আগে বিয়ে- আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও নীলফামারীর অনেক এলাকায় এটি এখনও সামাজিক বাস্তবতা। পারিবারিক অস্বচ্ছলতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে পড়ছে শত শত কিশোরীর ভবিষ্যৎ।

বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরীর বান্ধবী জানায়, বিয়ে না করার জন্য সে নানাভাবে আপত্তি জানায়। তবে তার কথা শোনা হয় না। তাকে অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর কথা জানালেও বিবাহ বন্ধের অভিযানে যেতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়। অসাধু চক্রের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনে জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরিবর্তন বা প্রকৃত বয়স গোপন করে সহজেই অনেক বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হচ্ছে বলে জানান বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির এ সদস্য।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের একজন বলেন, ‘একটা ক্লাস নাইনের মেয়ের ১৮ বছর বয়স হয়? হয় না। তারপরও সার্টিফিকেট তার বাবা-মা দেখাচ্ছে পুলিশকে যে, তাদের ১৮ বছর বয়স হয়ে গেছে। তাহলে এটা কেন হচ্ছে?’

যে নিরাপত্তাহীনতার কারণে অল্প বয়েসী মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে, বিয়ের পরও তা পাচ্ছে না অনেকে। বাল্যবিবাহের কারণে বাড়ছে আইনি জটিলতা, বাড়ছে মামলা। তাছাড়া বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রম নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে বলে জানান এই আইনজীবী।

নীলফামারীর নারী ও শিশু বিষয়ক আদালতের পিপি আসাদুজ্জামান খান রিনো বলেন, ‘ভোটের কারণেই হোক বা গরীব এসব বিভিন্ন কারণেই হোক তারা মেয়ের বয়স একটু বাড়ায় দিয়ে ১৮ বছর করে নিচ্ছে। ১৮ বছর করে দিয়ে বিয়েটা হয়ে যাবে। আমি যদি কোনো কমিটিতে না থাকি, তাহলে সামাজিকভাবে আপনারা কি করতেছেন এই ইনফরমেশনটা আমি কোনোভাবেই আপনাদেরকে দিতে পারতেছি না।’

আরও পড়ুন:

একজন কিশোরীর বিয়ের পরই শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক জটিলতা। বিশেষ করে গর্ভধারণের পর শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি। তৈরি হচ্ছে সাংসারিক জটিলতাও।

গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. ইউ এ রওশন আরা ইসলাম বলেন, ‘এসব মেয়েরা যখন গর্ভধারণ করে তার শরীর তো নিজেই ডেভেলপ না। অপুষ্ট এ অপরিণত শরীরে বাচ্চা চলে আসলে তার নানা ধরনের রোগ হয়। প্রথম হচ্ছে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, গর্ভকালীন হাইপারটেনশন, প্রি-এক্লাম্পসিয়া, এক্লাম্পসিয়া, খিঁচুনির মতো মারাত্মক রোগ। আলটিমেটলি দেয়ার ইজ এ হাই চান্স অফ ম্যাটারনাল ডেথ।’

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, জেলায় ১৫ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার ৭.৬ আর ১৮ বছরের নিচে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। চলমান বাল্যবিবাহের কথা স্বীকার করে সরকারি নানা প্রতিবন্ধকতার কথা জানালেন জেলা প্রশাসক।

নীলফামারীর বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির জেলা প্রশাসক ও সভাপতি মো. নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে কাজ করার কথা, মহিলাবিষয়ক এদের জনবলের খুবই শর্ট। এই শর্টেজের কারণে কিন্তু আমরা এখানে ভালো রিটার্নটা পাচ্ছি না। কিছু কিছু সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে আমরা কাজ করি, এরাও কাজ করছে। সেই তথ্যগুলো এখানে রিফ্লেকশনটা নাই।’

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, দরিদ্র পরিবারের সহায়তা এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে, তবেই কমবে এই সামাজিক ব্যাধি।

এফএস