সাতক্ষীরায় আর্সেনিকের ভয়াবহ থাবায় আক্রান্ত প্রায় প্রতিটি পরিবার

এখন জনপদে
0

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষ্ণকাটি আটঘরা গ্রামে আর্সেনিকজনিত রোগে গত দেড় দশকে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর দাবি স্থানীয়দের। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই রয়েছেন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগী। আক্রান্তদের জন্য বিশেষ কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই- বলেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। নিরাপদ পানি সরবরাহে বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

সাতক্ষীরার জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি গ্রামের আনছার মোড়লসহ তার পরিবারের সাত পুরুষ সদস্য গত কয়েক বছরে আর্সেনিকজনিত ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে দাবি স্বজনদের।

আর্সেনিকজনিত জটিল চর্মরোগে আক্রান্ত একই গ্রামের শফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন । তার দাবি, গত এক দশকে বাবা, মা, চাচা ও স্ত্রীসহ পরিবারের একাধিক সদস্য মারা গেছেন একই রোগে।

আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীরা জানান, আর তাদের যে কবরস্থান আছে, সেখানে আর কোনো জায়গা নেই। তিন পুরুষ চলবে কি চার পুরুষ চলবে সেখানে সব কবর দেয়া হয়েছে।

পাশের পাড়ার রেখা বেগমও আক্রান্ত জটিল চর্মরোগে। কয়েক বছর আগে একই রোগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি।

রেখা বেগম বলেন, ‘আমাদের গ্রামব্যাপী সবাই এই ঘায়ে আক্রান্ত। মধ্যে কিছু লোক ভালো আছে, প্রতিটা ফ্যামিলিতেই এক-দুইজন আছে এমন কোনো ঘা নেই। এই হাতে ঘা হইছে, ঘা চুলকায় খুব। পানি খাইলে বেশি হয়।’

গ্রামবাসীর দাবি, গত দেড় দশকে এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। ২০০৫ সালে নমুনা পরীক্ষায় ৯২ শতাংশের বেশি নলকূপের পানি দূষিত পাওয়া যায়। আর্সেনিকের প্রভাব স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি তৈরি করেছে সামাজিক সংকটও। ছোঁয়াচে না হলেও ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতে তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা।

আর্সেনিক আক্রান্ত পরিবারের সদস্যরা জানান, ‘তাদের এই বর্তমানে যে কলটা আছে, কলটাই ৯৫ শতাংশ আর্সেনিক। সেখানে হাতমুখ ধোয়া নিষেধ।

ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের নলকূপের পানিতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে বলে জানান এই জনপ্রতিনিধি।

সাতক্ষীরা তালা জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু বলেন, ‘প্রায় সবকটি গ্রামে এবং টিউবওয়েলগুলোতে আর্সেনিক, ব্যাপক আকারে আর্সেনিক। তার মধ্যে আমার ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের কৃষ্ণকাটি গ্রাম এবং সাত নম্বর ওয়ার্ডের শ্রীমন্তকাটি গ্রাম, এই দুটি গ্রামে আর্সেনিকের ব্যাপক খারাপ অবস্থা।’

দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে ত্বকের রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। এর নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই আর্সেনিকযুক্ত পানি পান বন্ধ করার পরামর্শ এই বিশেষজ্ঞের।

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহমান বলেন, ‘একটা ভুল ধারণা অনেকের থাকে যে আর্সেনিকযুক্ত পানি ফুটিয়ে পান করলে হয়তো সেটা বিশুদ্ধ হয়ে যায়। আর্সেনিকের ক্ষেত্রে এটা আসলে কখনো হয় না। আর্সেনিকের ক্ষেত্রে পানি ফোটালে আর্সেনিকযুক্ত পানি ফোটালে সেটা আরো বেশি মাত্রার বিষাক্ত হয়ে যায়। আমরা চেষ্টা করব আর্সেনিকযুক্ত পানি যত কম খাওয়া যায়, পরিহার করা যায়।’

আরও পড়ুন:

আর্সেনিক আক্রান্তদের বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই, তবে তাদের তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে বলে জানান সিভিল সার্জন।

সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আসলে ট্রিটমেন্টেরও ওরকম কিছু নাই। আর্সেনিকে আমরা সাধারণত এই যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিনগুলো আমরা দিই রোগীদেরকে। তো সেটা এই মুহূর্তে সাপ্লাই নেই। আমাদের ফিল্ডের কর্মীরা যখন ফিল্ডে বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে যায়, তখন সেখানে তাদের এইগুলো খোঁজার কথা আছে।’

গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলেও পানিতে লবণাক্ততা থাকায় অন্য এলাকা থেকে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করে- গ্রামে সরবরাহের পরিকল্পনার কথা জানায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজ বলেন, ‘গ্রাউন্ড ওয়াটারে আর্সেনিকের মাত্রা আমাদের বাংলাদেশের যে আর্সেনিকের যে এলাউবল লিমিট, এটার থেকে বেশি থাকার ফলেই আমরা মূলত এখানে দূরবর্তী একটি জায়গায় প্রোডাকশন টিউবয়েল স্থাপন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’

বিপর্যস্ত কৃষ্ণকাটি আটঘরা গ্রামের প্রায় তিন হাজার মানুষের জন্য বর্তমানে একটি গভীর নলকূপের পানিই ভরসা। দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে দ্রুত নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি স্থানীয়দের।


এফএস