উৎপাদন বাড়লেও মজুরি বঞ্চনায় চা শ্রমিকরা

এখন জনপদে , অর্থনীতি
বিশেষ প্রতিবেদন
1

শ্রমিকদের ঘামে প্রতি বছর চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও কমেনি তাদের বঞ্চনা। দ্রব্যমূল্য পাল্লা দিয়ে বাড়লেও চা শ্রমিকদের মজুরি সেভাবে বাড়ে না। প্রতিদিন ১৮৭ টাকা ৫০ পয়সা মজুরি নিয়ে দুর্দশার জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। বেশি বঞ্চনার শিকার নারী শ্রমিকরা। কর্তৃপক্ষ মে দিবসে আশার কথা শোনালেও কাজের কাজ কিছুই হয় না।

লংলা চা বাগানের হনুমান টিলার ৫০ বছর বয়সি চা শ্রমিক মালতি ভর। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাগানে পাতা তোলেন। সারাদিনে যা মজুরি পান তাতে সংসার চলে না। ঘরের অবস্থাও ভালো নয়, চাল দিয়ে পানি পড়ে। দুই মেয়েকে নিয়ে কষ্টের জীবন তার। লংলা চা বাগানের চা শ্রমিক মালতি ভর বলেন, ‘আমাদের চা শ্রমিকদের কোনো দিকে শান্তি নেই। এটাই আমাদের দুঃখ।’

একই অবস্থা মাদ্রাজি টিলার শুভদ্রা নাইড়ুর। কষ্ট করে নিজেই একটি ঘর করে মামার বাড়িতে থাকেন মা ও বোনের ছেলেকে নিয়ে।শুভাদ্রা নাইড়ু বলেন, ‘অনেক কিছু পরিবর্তন হয় কিন্তু চা শ্রমিকের কোনো পরিবর্তন নেই।’

প্রায় একই অবস্থা সব নারী চা শ্রমিকদের। ঘর, জমি, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনসহ নানা সমস্যা। সেকশনে বৃষ্টিতে ভিজে এসে, বাড়িতে টিনের চাল ছিদ্র থাকায়-সেখানেও ভিজতে হচ্ছে।

কয়েকজন মহিলা চা শ্রমিক জানান, যে জায়গাতে থাকি, জায়গার জন্য তাদের ট্যাক্স দেয়া লাগে। যে ঘরে থাকেন সেটাও তাদের না।

সরকারিভাবে ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি থাকলেও চা শ্রমিকরা সে ছুটি থেকে বঞ্চিত। এমনকি, সন্তান প্রসবের আগেরদিন পর্যন্ত কাজ করলেও পাচ্ছেন না ন্যায্য মজুরি। পৌনে ২০০ বছর ধরে বাগানে বসবাস করলেও ভূমির মালিকানা থেকে আজও বঞ্চিত তারা। প্রায় বাগানে নারী শ্রমিকদের জন্য নেই শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি কিংবা বিশ্রামাগার।

আরও পড়ুন

একজন শ্রমিক বলেন, ‘আমাদের মে দিবস হয়, মে দিবসে অনেক মানুষ লেকচার দেয় কিন্তু আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।’

চা বাগানের নারী শ্রমিকদের চিকিৎসা, সঠিক মজুরি আর গর্ভবতী ছুটি-কোনোটাই মেলে না। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন, এমনটাই চান এই চা শ্রমিকনেত্রী।

চা শ্রমিক নারী নেত্রী মনি গোয়ালা বলেন, ‘মে দিবসের যে একটা দাবি দেওয়া থাকে, যে স্লোগানের উপরেই সীমাবদ্ধ থাকে। আসলে এখন পর্যন্ত মে দিবসের কোনো কিছু, কোনো দাবি-দাওয়া এখন পর্যন্ত পূরণ হয়নি, আদৌ ভবিষ্যতে হবে কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

চা শ্রমিকদের সংগঠন প্রতিবছর মে দিবসে শ্রমিক সমাবেশে তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরে আসছে। অভিযোগ আছে, মালিক-শ্রমিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হলেও অনেক বাগান কর্তৃপক্ষ কাজের সমান মজুরি দিচ্ছে না।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, ‘নারীরাই কিন্তু চা বাগানে বেশিরভাগ পরিশ্রম করে থাকেন। এ নারীদের কিন্তু তেমন একটা সুলভ পরিবেশ নাই। চা বাগানে যেটা বলেন, টিলা, টক্কর, পাহাড়ে উঠে কিন্তু নারীরা কাজ করে।’

দেশে নিবন্ধিত ১৬৯ টি চা বাগানে কাজ করেন প্রায় দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক। যার ৫২ শতাংশেরও বেশি নারী শ্রমিক। মৌলভীবাজারে ৯৩টি চা বাগানে কাজ করেন প্রায় এক লাখ শ্রমিক। তাদের আশা, মে দিবসে ভূমির মালিকানাসহ তাদের দাবিগুলো বাস্তবে রূপ দিয়ে জীবনমান উন্নয়নে এগিয়ে আসবে সরকার।

জেআর