একজন নারীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হলো তার ঘর, হোক সেটা বাবা, স্বামী কিংবা তার নিজের ঘর। যেখানে সারা দিনের ক্লান্তি শেষে প্রাণ ভরে নিরাপদে বিশ্রাম নিতে পারবে।
তবে বাস্তবতা আজ ভয়াবহ। যে ঘরে শান্তি খুঁজে পাওয়ার কথা, সেই ঘরই এখন হাজারো নারীর জন্য হয়ে উঠেছে কষ্ট আর অনিরাপদ স্থান।
এইতো গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতের স্বামীর বাসা থেকে মুক্তা ইসলাম মাওয়া নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনার দু’দিন আগে খাটের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করতে দেখা যায় এক ভিডিওতে। যেখানে মুক্তা তার স্বামীকে ভালোবাসার কথা বলেও মন গলাতে পারেনি।
এর আগে চলতি বছরের ১৭ মে গাজীপুরে স্ত্রী, দুই সন্তানসহ পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করে ফোরকান নামের এক ব্যক্তি। আলোচিত হত্যাকাণ্ড শিশু কন্যা রামিসা, আসিয়ারাও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল প্রতিবেশী ও বোনের বাসায়।
আরও পড়ুন:
চলতি বছরের পরিসংখ্যান বলছে, গত আট মাসে প্রায় ৪০০ নারী ও কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার প্রায় ৪৫০ জন। এর বাইরে নানা ধরনের পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৮০০-এর বেশি নারী ও শিশু। যার প্রভাবে অনেকে যেমন বেছে নেন আত্মহননের পথ, তেমনি বাধ্য হন ডিভোর্সের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও। আর সহিংসতার এমন ঘটনায় উদ্বিগ্ন সাধারণ নারীরাও।
নারীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘মা হিসেবে, নারী হিসেবে, একজন স্ত্রী হিসেবে, কিন্তু সেই হিসেবে সে আজও সমাজে অবহেলিত। সে ওই জায়গাটার, মানে একটা যে তার সম্মান, সে ওই ফ্যামিলিতে ওইভাবে সে সম্মানটা পাচ্ছে না।’
অন্য একজন বলেন, ‘যে বাড়িটা তার সব থেকে সেফ জায়গা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তার হাজবেন্ডের কাছে অথবা তার খুব কাছের মানুষদের কাছে হোম ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছে, যেটা আসলে আমাদের সবার জন্যই খুবই আতঙ্কজনক।’
নারীর প্রতি সহিংসতার প্রশ্ন যখন আসে, একটি প্রচলিত ধারণা, ঘরের চেয়ে বাইরেই নারীরা বেশি অনিরাপদ। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৪ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি জরিপে দেখা যায়, দেশের প্রায় চার নারীর মধ্যে তিনজনই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নিজের ঘরে। এরকম যখন বাস্তবতা, তখন আবারও প্রশ্ন ওঠে, নারীরা ঠিক কোথায় নিরাপদ?
আরও পড়ুন:
এই প্রশ্ন ছিল নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা ডা. ফৌজিয়া মুসলিমের কাছে।
তিনি বলেন, ‘ঘরে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায়, বাসে, বাজারে, হাটে— কোথাও নারীর নিরাপত্তা নেই। আইনের দুর্বলতার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। আইন যতটুকু আছে, সে আইনগুলা কিন্তু যথেষ্ট প্রোগ্রেসিভ।’
২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার কাজ শেষ করার কথা বলা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে না। বিচারক স্বল্পতা, বিচারিক কাঠামোগত দুর্বলতাসহ নানা কারণে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে আদালতের কাঠামোগত পরিবর্তন আর উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
আইনজীবী ও নারী অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ‘আমাদের মূল থেকে সমস্যাটা সমাধান করতে হবে। সেই সমস্যা সমাধানের জন্য এই কোর্টগুলোকে উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, কোর্টের স্ট্রাকচার বাড়ানো এবং বিচারক নিয়োগ এবং তার পাশাপাশি প্রশাসনিক যে নিয়োগগুলোর বিষয় আছে সেগুলোকে ঠিক করতে হবে।’
নারীদের ওপর সহিংসতা কমাতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার পাশাপাশি বিচারিক কাজ দ্রুত নিষ্পত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।





