ঘন কুয়াশায় শাহজালালে ফ্লাইট ডাইভার্ট; বাড়ছে যাত্রী ব্যয়-ভোগান্তি

অর্থনীতি , দেশে এখন
বিশেষ প্রতিবেদন
1

শাহজালাল বিমানবন্দরে ঘন কুয়াশায় একের পর এক ফ্লাইট ডাইভার্ট হচ্ছে। এক সপ্তাহেই ৫০টির বেশি ফ্লাইট ডাইভার্ট করে অবতরণ করেছে চট্টগ্রাম, সিলেট বা কলকাতাসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরে। এতে ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেমে ফের অবনতি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাড়ছে যাত্রী ভোগান্তি। ব্যাহত হচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলোর শিডিউল। বাড়তি খরচের চাপে পড়ছে পুরো বিমান চলাচল ব্যবস্থা। এদিকে শীতজুড়েই এই সংকট থাকবে বলে জানিয়েছে সিভিল অ্যাভিয়েশন।

শীত আসলেই মধ্যরাতের পর থমকে যায় আকাশপথ। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে রানওয়ে। ডজনখানেক ফ্লাইট ডাইভার্টেড, কোনটি চক্কর কাটে ঢাকার আকাশে, কোনটা নামতে বাধ্য হয় অন্য শহরে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সকালের কুয়াশা ভেদ করে যখন প্রথম বিমানটি রানওয়েতে ছোঁয়, ততক্ষণে ক্লান্তি জমে বৈমানিক আর যাত্রী দুপক্ষেরই। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ দৃশ্য শীতের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

জটিলতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিমানবন্দরের ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম আইএলএস। চলতি বছরের জুলাইয়ে ক্যাটাগরি দুই উদ্বোধনের মাত্র তিন মাস পর, অক্টোবর ২০২৫ এ একটি থাই এয়ারওয়েজের বিমান অবতরণের সময় রানওয়ের লাইটিং সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে আইএলএসের কার্যক্ষমতা নেমে আসে ৮৫ শতাংশে, যেখানে ক্যাটাগরি দুই সচল রাখতে প্রয়োজন অন্তত ৯৫ শতাংশ কার্যকর আলো ব্যবস্থা। বাধ্য হয়েই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ফিরে গেছে আগের ক্যাটাগরি এক ব্যবস্থায়। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাই মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুবিধা।

বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর ই আলম বলেন, ‘এ ড্যামেজ হওয়ার কারণে লাইটের যে সার্বিসিলিটি আছে, এটা নেমে গিয়েছে ৮৪ থেকে ৮৭ শতাংশে নেমে গিয়েছে। পাইলট ল্যান্ড করতে আসছে কিন্তু লাইটটা যদি ৯৫ শতাংশের ওপর সার্ভিস না দেয় তাহলে আমরা ক্যাটাগরি-২ করতে পারি না। যে কারণে এখন ক্যাটাগরি-২ অপারেশন সাসপেনডেড আছে।’

সিভিল এভিয়েশনের তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহেই ৫০টির বেশি ফ্লাইট ডাইভার্ট হয়ে অবতরণ করেছে চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা কলকাতাসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরে। শুধু ২ থেকে ৪ জানুয়ারির মধ্যেই ডাইভার্ট হয়েছে ২০টিরও বেশি ফ্লাইট।

এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি এয়ারলাইন্সের ওপর। অন্য বিমানবন্দরে নামতে গিয়ে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ল্যান্ডিং চার্জ, বাড়ছে জ্বালানি খরচ। সেই সঙ্গে যাত্রী ও ক্রুদের হোটেলে রাখার ব্যয় সব মিলিয়ে বাড়ছে পরিচালন ব্যয় ও লোকসান।

আরও পড়ুন:

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম বলেন, ‘শীতকালে যখন কুয়াশার এ সমস্যাটা হয় তখন প্রায়ই আমাদের ফ্লাইট ডাইভার্ট হয়ে যায়। আর ফ্লাইট ডাইভার্ট হওয়া মানেই তো খরচ বেশি হওয়া। প্যাসেঞ্জারদের হোটেলে রাখতে হয়। অন্য একটা এয়াপোর্টে গিয়ে ল্যান্ড করতে হয়। সেটার খরচ আছে।’

আর যাত্রীদের দুর্ভোগ যেন শেষই হচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, কখনো আকাশে চক্কর, কখনো ভিন্ন শহরে অবতরণ। ঢাকায় ফিরেও স্বস্তি নেই একসঙ্গে একাধিক বিমান নামায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে সৃষ্টি হচ্ছে জট। শুধু লাগেজ বহনের ট্রলির জন্যই অনেককে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

যাত্রীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার ডিলে হয়ে পরের দিন রাত ১১টায় ফ্লাইট দিছে। এখানে সকাল ৬টায় নামার কথা ছিল। কিন্তু এখানে এসে আবার কলকাতা গিয়ে ল্যান্ড করছে। ওখানে আবার ৬ ঘণ্টা বসে ছিলাম।’

সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে লাইটগুলো বিশেষ অর্ডারে কাস্টমাইজ করে বিদেশ থেকে আনতে হয়। এ মেরামত শেষ করে পূর্ণাঙ্গ ক্যাটাগরি–২ সুবিধা ফিরিয়ে আনতে আরও প্রায় তিন মাস সময় লাগতে পারে।

নূর ই আলম বলেন, ‘যে কোম্পানিকেই ওয়ার্ক অর্ডার দিইনা কেন, তাদের আবার কাস্টম করে ওই লাইটগুলো তৈরি করে নিয়ে এসে লাগাতে তারা আড়াই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। এ তিন মাসের মধ্যে আমি লাইটের ৯৫ শতাংশ সার্ভিস পাবো না। এটা ড্যঅমেজ অ্যাসেস করার পর মোটামুটি থাই এয়াওয়েজকে একটা ওয়ার্নিং দিয়ে রাখা হয়েছে যে, তোম রা এরকম একটা ড্যামেজ করেছো। এটা আমাদের ইনভেস্টিগেশন হচ্ছে। ফাইনালি আমরা যখন অ্যাসেসমেন্টটা করতে পারবো যে, কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হলো এখানে সেটা তাদের জানানো হবে।’

আইএলএস ক্যাটেগরি-২ চালু হওয়ায় এ শীতেই প্রথমবারের মতো ঘন কুয়াশাতেও নির্বিঘ্নে অবতরণের সস্তি পাওয়ার কথা ছিল ঢাকার যাত্রীদের। কিন্তু কারিগরি ব্যর্থতায় সে প্রতীক্ষিত সুবিধা অধরাই থেকে গেল।

এসএস