যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি: যেভাবে মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠলো পাকিস্তান

ডোনাল্ড ট্রাম্প, শাহবাজ শরিফ ও মুজতবা খামেনি
বিদেশে এখন
1

ইসলামাবাদ—পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে কঠোর নিরাপত্তা লকডাউন কার্যকর করতে হঠাৎ দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে শহরের রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গেছে। ব্যারিকেডের আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে; যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ সপ্তাহান্তের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতি আলোচনা ঘিরে বিশ্বজুড়ে অপেক্ষা বাড়ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি ও নড়বড়ে অর্থনীতির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক শিরোনামে থাকা পাকিস্তানই ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রথম সরাসরি আলোচনা আয়োজন করছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এ যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

নিরাপত্তা-উদ্বেগের দৃষ্টিতে দীর্ঘদিন দেখা একটি দেশের জন্য এটি বড় পরিবর্তন। এতে বোঝা যায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের পর থেকে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক কতটা বদলেছে। সে সময় ট্রাম্প পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনকে ‘মিথ্যা আর প্রতারণা ছাড়া কিছুই দেয়নি’ বলে অভিযোগ করেছিলেন।

এ সপ্তাহান্তের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার উপস্থিত থাকতে পারেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। জেডি ভ্যান্স এলে ২০১১ সালের পর পাকিস্তান সফর করা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হবেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভৌগোলিক প্রয়োজন, দক্ষ কূটনীতি এবং আঞ্চলিক জোটে পরিবর্তনের সমন্বয়ে পাকিস্তানকে একটি অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত করেছে। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সাউথ এশিয়া ইনিশিয়েটিভসের পরিচালক ফারওয়া আমের বলেন, শেষ মুহূর্তে এই কূটনৈতিক অগ্রগতি আনতে পারায় পাকিস্তান ‘অনেক বিশ্বাসযোগ্যতা’ অর্জন করেছে। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের সক্রিয় সহায়তা ও সাফল্য ইসলামাবাদকে এমন এক পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, যে নিজস্ব উদ্যোগ দেখাচ্ছে এবং বৃহত্তর অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তাতে সক্রিয় অংশীজন হিসেবে থাকছে।

সন্দেহ থেকে আস্থা

গত বছর পর্যন্ত পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের অনির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা হতো। আফগানিস্তান যুদ্ধে ওয়াশিংটনকে সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি একই সময়ে তালেবানকে সমর্থনের অভিযোগও ছিল।

২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রায় এক মাইল দূরে তিনি লুকিয়ে ছিলেন—এ ঘটনায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বিব্রত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা নিয়েও সমালোচনা বাড়ে। ট্রাম্পও বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আল-কায়েদা নেতাকে আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন।

ট্রাম্পের পূর্বসূরি জো বাইডেন তার মেয়াদে দায়িত্বে থাকা পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রীকেই ফোন করেননি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমন্ড এ ওয়ালশ স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী আকিল শাহ বলেন, পাকিস্তান কার্যত ‘একঘরে’ রাষ্ট্রের মতো ছিল। তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসন পাকিস্তানের সঙ্গে তেমনভাবে যুক্ত হয়নি; নির্দিষ্ট কোনো কৌশলগত স্বার্থও ছিল না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ট্রাম্প ২.০’ যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে; বন্ধুত্বে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে এবং শত্রুপক্ষও তার প্রেসিডেন্সির ঘনিষ্ঠতায় আসছে—যদি তাদের দেয়ার মতো কিছু থাকে।

খনিজ সম্পদ, জ্বালানি ঝুঁকি ও কৌশলগত হিসাব

পাকিস্তান দাবি করছে, দেশটির কাছে ট্রিলিয়ন ডলারের বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ রয়েছে—এতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এছাড়া গত বছর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সংঘাতের পর ইসলামাবাদ দ্রুত প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে লড়াই থামাতে তার প্রচেষ্টার জন্য প্রশংসা করে।

টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ফাহদ হুমায়ুন বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে পাকিস্তানের বাস্তব আগ্রহ ছিল। তিনি বলেন, (ভারতের সঙ্গে সংঘাতে) পাকিস্তান তুলনামূলকভাবে সংযত থেকেছে, কারণ দেশটি প্রকাশ্যে উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে ছিল এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা স্বীকার করেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এরপর থেকে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বিরল খনিজ নিয়ে চুক্তি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন এবং ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যুক্ত হয়েছেন।

ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলেছেন। বুধবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় ইসলামাবাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকার কথা ট্রাম্প স্বীকার করাও নজর এড়ায়নি।

তবে পাকিস্তানের যুদ্ধ শেষ দেখতে চাওয়ার নিজস্ব কারণও আছে। ইরানের হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ঘিরে জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়েছে; দেশটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাসের বড় অংশ আমদানি করে। পাকিস্তান গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেছে; যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পাকিস্তানকে রিয়াদের পক্ষে দাঁড়াতে হতে পারতো।

ফাহদ হুমায়ুন বলেন, এই সংঘাতে ইরানের পূর্বে থাকা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় পাকিস্তানের অংশীদারত্ব বা স্বার্থ বেশি ছিল। তিনি বলেন, পাকিস্তান কখনোই ইরানবিরোধী কোনো জোটের অংশ ছিল না, যে জোট গঠন হতে শুরু করেছিল।

সূক্ষ্ম নিরপেক্ষতা ও চীন-সম্পর্ক

পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ৯০০ কিলোমিটারের অস্থির সীমান্ত রয়েছে। এ অঞ্চলে উভয় পাশে জাতিগত বালুচ জনগোষ্ঠীর গভীর সম্পর্ক আছে; তারা তেহরান ও ইসলামাবাদের নেতৃত্বের অধীন থাকার বিষয়ে দীর্ঘদিন অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। ইরানের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশও পাকিস্তানে।

উপসাগরীয় অন্যান্য ইসলামি দেশের মতো পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই এবং দেশটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যও হয়নি। ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবরোধের মধ্যেও পাকিস্তানি জাহাজকে তা এড়িয়ে যাওয়ার অনুমতিও দিয়েছে। ফারওয়া আমের বলেন, তেহরান ও ওয়াশিংটন—দুই পক্ষের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক থাকায় পাকিস্তান একটি অনন্য অবস্থানে ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই ভারসাম্যকে জোরালো করেছে। ভারতের প্রতি পারস্পরিক সন্দেহ এবং বহু বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরকে কেন্দ্র করে এই ‘অল-ওয়েদার’ অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠক করেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফাহদ হুমায়ুন বলেন, পাকিস্তান চীনের সঙ্গে যোগাযোগের একটি পথও গড়ে তুলেছিল; পাকিস্তানের যোগাযোগ ও চীনের সমর্থনের সমন্বয় ইরানিদের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, কড়া নিরাপত্তা

‘ইসলামাবাদ আলোচনা’র আগে রাজধানীতে নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। সরকার সেরেনা হোটেল সংরক্ষণ করেছে। হোটেলটির বর্তমান অতিথিদের জায়গা ছাড়তে বলা হয়েছে; স্থানান্তরের জন্য তাদের ক্ষতিপূরণও দেয়া হচ্ছে।

তবে আলোচনা প্রস্তুতির মধ্যে যুদ্ধবিরতি ইতিমধ্যে পরীক্ষায় পড়ছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, লেবাননে ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনে ১৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি না দেয়া পাকিস্তান এ হামলার নিন্দা করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক বিবৃতিতে বলেন, ইসরাইলের এসব পদক্ষেপ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে।

ইসলামাবাদে সাংবাদিকেরা ঐতিহাসিক আলোচনা কাভার করতে ভিসার জন্য আবেদন করতে থাকায় হোটেলগুলো দ্রুত বুকড হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বে বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে। ফাহদ হুমায়ুন বলেন, নানা বিষয় এমনভাবে একত্র হয়েছে, যা পাকিস্তানকে এই সময়ে কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে।

পাকিস্তান, ইসলামাবাদ, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি, আজকের খবর: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি যুদ্ধবিরতি আলোচনা সামনে রেখে ইসলামাবাদে কড়া নিরাপত্তা লকডাউন; পাকিস্তানকে মধ্যস্থতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

এএম