খলিলুর-জয়শঙ্কর বৈঠক: হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি পুনর্ব্যক্ত; রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের ইঙ্গিত

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর
দেশে এখন
0

ভারতের সঙ্গে আলোচনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি ‘পুনর্ব্যক্ত’ করেছে বাংলাদেশ— এমনটাই জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গতকাল (শুক্রবার, ১০ এপ্রিল) মরিশাসের পোর্ট লুইসে তিনি এ তথ্য জানান। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে সম্ভাবনাও ইঙ্গিত দেন তিনি। ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দু প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে আগের অন্তর্বর্তী সরকার একই অনুরোধ করেছিল। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বিএনপি সরকার প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে চায়। তিনি চলতি সপ্তাহে দিল্লি সফরে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি ৯ম ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে অংশ নিতে মরিশাসে যান।

ঢাকা ফেরার আগে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে অনুরোধের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দ্য হিন্দুকে বলেন, ‘আমরা এরইমধ্যে আমাদের প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন চেয়েছি। আমরা তা পুনর্ব্যক্ত করেছি।’

আলোচনায় ভারতের প্রতিক্রিয়া নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি। তবে খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠকের পর দেশটির মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দুই পক্ষ প্রাসঙ্গিক দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে অংশীদারত্ব আরও গভীর করার প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করতে সম্মত হয়েছে।’ এতে নির্দিষ্ট ফলাফল উল্লেখ করা হয়নি এবং বলা হয়, শিগগিরই ‘পরবর্তী বৈঠক’ হবে।

দিল্লিতে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে তিনি যথেষ্ট আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘দুই দেশের নেতা অর্থাৎ আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শুধু চিঠি আদান-প্রদানই করেননি, তারা কথা বলেছেনও। উভয়েই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চান। এটি দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আমরা কীভাবে এটিকে সামনে এগিয়ে নেয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমি আশা করি, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমরা এটি করতে পারবো।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যিনি গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়েছেন, শিগগিরই ভারত সফর করবেন কি না—এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘সফর হবে, তবে তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সফরের আগে অনেক কিছু হবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এই ‘স্টপ-ওভার’ দিল্লি সফর এবং ভবিষ্যতে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ইঙ্গিত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আগের অন্তর্বর্তী সরকারের ড. ইউনূস প্রশাসনের সঙ্গে উত্তেজনা এবং শেখ হাসিনার আমলে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতির পর ভারতের সঙ্গে নতুন বাংলাদেশ সরকারের এটাই ছিল প্রথম এমন যোগাযোগ।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে বর্তমানে দিল্লিতে বসবাস করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে, অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন। এর কয়েক দিন পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারতে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়। কারণ, আন্তর্জাতিক অবপরাধ ট্রাইব্যুনালে তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, ‘বিষয়টি বিচারাধীন ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।’

খলিলুর-জয়শঙ্করের আলোচনায় ভারতের কাছ থেকে ভিসা পুনরায় চালুর বিষয়ও উঠে এসেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ঘাটতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

দ্য হিন্দুকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর বলেন, ‘এখনো আমরা কিছুই দেখিনি, এটি আরও খারাপ হবে। এই সংকটের মুখে একা মোকাবিলা করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এর প্রভাব বছরের পর বছর পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭০-এর দশকের দ্বৈত তেল সংকট—১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধ এবং ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এবং ১৯৮০-এর দশককে উন্নয়নের হারানো দশকে পরিণত করেছিল। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, নাহলে প্রত্যেকে আলাদাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।’

তিনি জানান, বাংলাদেশ এবার বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে এ বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহী। এমনকি স্থগিত থাকা সার্ক নিয়েও আগ্রহী।

খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবাই যদি একসঙ্গে কাজ করি এবং যেসব কারণে কিছু দেশ অংশ নিতে চায় না; সেগুলো দূর করি—তাহলে সার্ক সম্মেলন আয়োজনে কোনো আপত্তি থাকবে না। সবই যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়।’

পাকিস্তানের সীমান্তপারের ‘সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের’ কারণে ভারতের সম্মেলনে অংশ না নেয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ কথা বলেন।

এএম