ওয়াশিংটন হিল্টনের বেজমেন্টে তখন হোয়াইট হাউজ করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নৈশভোজের আসর বসেছে। ঘড়িতে সময় তখন রাত সাড়ে আটটার কিছু বেশি। দীর্ঘ বিরতির পর এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মঞ্চে বসে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক উইজিয়া জিয়াংয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। সামনে আড়াইশোর বেশি টেবিলে কয়েক হাজার আমন্ত্রিত অতিথি। ঠিক সে মুহূর্তেই হোটেলের লবি থেকে ভেসে আসে গোলাগুলির শব্দ। পরিস্থিতি বুঝে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম খাবারের কোনো ট্রে পড়ে গেছে।’
গোলাগুলির শব্দ শোনামাত্রই বলরুমে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে শত শত মানুষ মুহূর্তের মধ্যে টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন। সাংবাদিক থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও তখন জীবন বাঁচাতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে শুয়ে পড়েন। কেউ টেবিল ক্লথ দিয়ে শরীর ঢাকার চেষ্টা করেন, কেউবা দেয়ালের কাছে লুকান। চারদিকে তখন একটাই চিৎকার—‘নিচে নামুন, নিচে নামুন!’
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত মঞ্চে ঝাপিয়ে পড়েন। প্রথমে তারা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে সরিয়ে নেন। এর কয়েক সেকেন্ড পরই ট্রাম্পকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সারিতে থাকা অন্য কর্মকর্তাদেরও দ্রুত সরিয়ে নেয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ভিড় ঠেলে কর্মকর্তাদের বের করে নেয়ার সময় বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ে। এ সময় ধাক্কাধাক্কিতে বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা হারমিত ধিলনসহ কয়েকজন আহত হন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল নিরাপত্তারক্ষীদের বেষ্টনীতে বলরুমের বাইরে অবস্থান নেন।
এদিকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে বিপরীতমুখী নির্দেশনা আসতে থাকে। সিক্রেট সার্ভিস কর্মকর্তারা যখন সবাইকে হোটেল ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তখন করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা সাংবাদিকদের ভেতরেই অবস্থান করতে বলছিলেন।
আরও পড়ুন:
এক কর্মকর্তা চিৎকার করে বলছিলেন, ‘এটা এখন ক্রাইম সিন (অপরাধস্থল), সবাই দ্রুত হোটেল ছেড়ে বের হয়ে যান।’
রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে ট্রাম্প কড়া পাহারায় হোটেল ত্যাগ করেন। এর এক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘পুরো বিষয়টি ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। এ আয়োজনটি ছিল বাকস্বাধীনতার উদযাপনের জন্য, যেখানে দুই দলের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের একত্রিত হওয়ার কথা ছিল। এক অর্থে সেটি হয়েছেও।’
এ সময় ট্রাম্প হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, এর আগে পেনসিলভানিয়ার বাটলার শহরে নির্বাচনি সভায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। এরপর তার গলফ কোর্সেও হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়া হয়। তিনি বলেন, ‘এ ভবনটি খুব একটা নিরাপদ নয়। এ গোলাগুলিই প্রমাণ করে কেন আমার একটি নিজস্ব বলরুম দরকার।’
সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের জন্য পরিচিত হলেও এদিন ট্রাম্পের কণ্ঠে ভিন্ন সুর শোনা যায়। তিনি গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং এই নৈশভোজটি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আবারও আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দেন। ট্রাম্প রসিকতা করে বলেন, ‘আমি আজ সাংবাদিকদের কড়া সমালোচনা করে একটি ভাষণ দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। সেটি সম্ভবত আর দেয়া হবে না। পরের বার আমি খুব একঘেয়ে কথা বলবো।’
উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন হিল্টনে এই নৈশভোজের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। তবে ১৯৮১ সালে এই হোটেলের বাইরেই প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন জন হিঙ্কলে জুনিয়র। এরপর থেকে এটি ‘হিঙ্কলে হিল্টন’ নামেও পরিচিতি পায়।
শনিবারের এ অনুষ্ঠানে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো অতিথিকে মেটাল ডিটেক্টরে তল্লাশি করা হলেও অনেকের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, তারা এক সন্দেহভাজনকে আটক করেছে। সোমবার তাকে আদালতে তোলা হবে।





